শিশু-কিশোর ও নবীনদের পত্রিকা

মাসিক আল-কলম-পুষ্প

রবিউল আউয়াল ১৪৪০হিঃ (৩/৭) | তোমাদের পাতা

অনুবাদের সৌন্দর্য-অসৌন্দর্য

একটি উর্দূ বাক্য দেখুন- শরী‘আত প্যর আম্যল ক্যরো, আওর কিসী কী দিলশিক্নী কাা খায়াাল ম্যত ক্যরো। কিউঁকে দূসেের কী দিলশিক্নী েেস আপনী দ্বীনশিক্নী য্যয়াাদা কাাবিলে ইহতিরাায হ্যয়।

এর একটি বাংলা তরজমা হলো, ‘শরী‘আতের উপর আমল করো। আর কারো মনঃকষ্টের পরোয়া করো না। কারণ অন্যের মনঃকষ্টের চেয়ে দ্বীনের ক্ষতি না করাটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

‘যিয়াদা কাবিলে ইহতিরাায হ্যয়’ এর শব্দানুগ তরজমা হলো, বেশী/অধিক পরিহারযোগ্য। অনুবাদক চিন্তা করেছেন, শাব্দিকতা এখানে তরজমার আবেদন ক্ষুণœ করছে। তাই তিনি শাব্দিকতা থেকে সরে এসে ‘সরল অনুবাদ করেছেন, ‘বেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।’

অনুবাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের চিন্তা প্রশংসনীয়। অবশ্য এখানে চিন্তা করে দেখা যায়, ‘ব্যাপার’-এর পরিবর্তে ‘বিষয়’ হলে কেমন হয়? ব্যাপার শব্দটির মধ্যে কিছুটা স্থুলতা রয়েছে। তাই এর ব্যবহারক্ষেত্র অত্যন্ত সীমিত। অভিজাত ও ভাবগম্ভীর এবং আবেদনপূর্ণ ও কোমল ক্ষেত্রগুলোতে এর ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, শব্দটাই এখানে حشو বা বাহুল্যদুষ্ট কি না ভেবে দেখা যায়।

‘দিলশিক্নী’ এর তরজমা ‘মনঃকষ্ট’ ঠিক আছে। কিন্তু দু‘ই ‘শিকনি’-এর যে সুরছন্দগত সৌন্দর্য তা যথেষ্ট ক্ষুণœ হয়েছে। 

আসলে এটা ফারসী থেকে উর্দূতে যেমন এসেছে, তেমনি ফারসি বা উর্দূ থেকে বাংলায় স্বচ্ছন্দে আসতে পারে। বাংলায় এর ব্যবহারযোগ্যতা রয়েছে। শুরুতে কিছুটা অপরিচিত মনে হতে পারে, তবে ব্যবহারে ব্যবহারে অপরিচয় দূর হয়ে যাবে। সুতরাং এরূপ তরজমা সুন্দরই হবে, ‘কারণ অন্যের দিল শিক্নি থেকে বাঁচার চেয়ে নিজের দ্বীনশিক্নি থেকে বাঁচা বেশী জরুরি।’

শব্দটির ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি, আবার শুরু হওয়ার পর, পরিচিত ও প্রচলিত হতেও যথেষ্ট সময় লাগবে। সে হিসাবে যদি বলা হয়, এ শব্দের উপস্থিতি অনুবাদের সৌন্দর্য কিছুটা হলেও ক্ষুণœ করবে। ঠিক আছে। তাহলে অন্যভাবে চেষ্টা করে দেখি, ‘শিক্নি’-এর সুরছন্দ অনুবাদে রক্ষা করা যায় কি না।

‘শরী‘আতের উপর আমল করো, তাতে কার মন ভাঙ্গলো, কার ভাঙ্গলো না, সে চিন্তা করো না। কারণ কারো দিল আবাদ করার জন্য নিজের দ্বীন বরবাদ করা কিছুতেই উচিত নয়/ কেননা নিজের দ্বীন বরবাদ করে কারো দিল আবাদ করা চরম সর্বনাশের কারণ।

অনুবাদ্কে চলনসই থেকে সুন্দর এবং সুন্দর থেকে সুন্দরতর; তারপর হৃদয়গ্রাহী ও আবেদনপূর্ণ করার নিরন্তর চেষ্টা আমাদের করে যাওয়া দরকার।

আরেকটি উর্দূ বাক্য দেখুন, ‘সাালিক েেক লিয়ে জরুরি হ্যয় কে জোা চীয মুবাাহ হ্যয় শুরু েেমঁ উসসে ভী ইজতিনাাব ক্যেের।

এর একটি তরজমা হলো, সালেকের জন্য জরুরি হলো, শুরুতে মুবাহ জিনিসও পরিহার করবে।

এখানে প্রথম পর্বে শাব্দিকতা রক্ষা করা হয়েছে, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় পর্বে শাব্দিকতা থেকে সরে এসে সরল তরজমা করা হয়েছে।

আরেকটি তরজমা হলো ‘আধ্যত্মিক সাধকের জন্য অবশ্যকর্তব্য হলো, যে সব জিনিস বৈধ, শুরুতে তা থেকেও দূরে থাকা।

এখানেও শাব্দিক ও সরল অনুবাদের মিশ্রণ ঘটেছে, আর তা প্রথমটি চেয়ে তুলনামূলক সহজবোধ্য হয়েছে। কারণ সালিক ও মুবাহ শব্দদু’টি পরিহার করা হয়েছে। তাছাড়া ‘মুবাহ জিনিসও’ এই সঙ্কোচনটি এখানে বোধগম্যতা ক্ষুণœ করেছে। আর অনেকগুলো ভারী আরবী শব্দের সঙ্গে পরিহার-এর উপস্থিতি সঙ্গতিপূর্ণ মনে হয় না।

দ্বিতীয় তরজমায় সালিক শব্দটি স্বল্প পরিচিত ও অপ্রচলিত মনে করে বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ঠিক আছে। তবে আরো সুন্দর হয় আতফ-এর উসলূব ব্যবহার করে ব্যখ্যামূলক তরজমা করা, যাতে তাছাউফের অঙ্গনে অপরিহার্য পরিভাষাটি ধীরে ধীরে পরিচিতি ও প্রচলন লাভ করতে সক্ষম হয়।

যেমন ‘আধ্যাত্মিক সাধক ও সালিকের অবশ্যকর্তব্য হলো...।

কিংবা আতফের পরিবর্তে সরাসরি তাফসীরী তরজমা হতে পারে। যেমন- আত্মশুদ্ধির সাধনায় নিয়োজিত সালিকের অবশ্যকর্তব্য হলো ...।

আরেকটি উর্দূ বাক্য দেখুন। জনৈক প্রজ্ঞাবান আলিম নিজের শ্রদ্ধেয়া আম্মাজানের মৃত্যুশয্যার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘পিয়াাস কী শিদ্দ্যত কী ওয়াজেসে পাানী ব্যহুত পিয়াা গ্যয়াা। ইয়াহাাঁ ত্যক কে েেপট  েেমঁ গ্যয়রে মা‘মূলী ন্যফখ হোা গ্যয়া।...

এখানে চিন্তা করে দেখুন, অত্যধিক পানি পানের কারণে পেট ফুলে ওঠার যে চিত্রকল্প দৃশ্যমান হচ্ছে তা কি খুব সুন্দর হলো? আপনি কি আপনার মায়ের ক্ষেত্রে এরূপ চিত্রায়ণ পছন্দ করবেন?!

যিনি বাংলায় তরজমা করেছেন, ‘পিপাসার তীব্রতার কারণে পানি অনেক পান করা হলো। এমনকি পেট অস্বাভাবিক ফুলে উঠলো।’

তিনি কি মূল লেখক ও তাঁর আম্মাজানের প্রতি সুবিচার করেছেন? তার কি কর্তব্য ছিলো না, এমনভাবে তরজমা করা যাতে বাস্তবতাও রক্ষিত হয়, আবার চিত্রকল্পের অসৌন্দর্যও দূর হয়!

তদুপরি এখানে তো বাংলা তরজমাটি মূলের চেয়েও অসুন্দর হয়েছে। কারণ মূলে ‘ফূলনা’ এর পরিবর্তে ‘নাফখ’ শব্দ ব্যবহার করে চিত্রকল্পে কিছুটা সতর ও প্রচ্ছন্নতা রক্ষা করা হয়েছে, বাংলায় তাও রক্ষিত হয়নি। যদি তরজমা করা হতো, ‘ফলে পেটে অস্বাভাবিক স্ফীতি  হলো/ফলে অস্বাভাবিক উদরস্ফীতি হলো। তাহলে তরজমাটি অন্তত মূলের সমস্তরে এসে যেতো।

একটি সুন্দর তরজমা দেখুন, ‘প্রচ- পিপাসায় অনেক পানি পান করার কারণে অবস্থা আরো গুরুতর হয়ে পড়লো।’

বলূন তো এ তরজমায় অনুবাদপাঠকের কাছে লেখক ও তার লেখার ভাবমর্যাদা রক্ষিত হয়েছে কি না! আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন, আমীন।

 (চলবে ইনশাআল্লাহ)