রবিউছ ছানী ১৪৪৫ হিঃ

সম্পাদকের রোযনামচা

সম্পাদকের রোযনামচা

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

 

১৩ -২ - ৪৫ হি. বুধবার

এ পর্যন্ত যত লেখা এসেছে, শিশুদের বানানভুল তুলনামূলক কম, যথেষ্ট কম। কিশোর ও নবীনদের বানানভুল বেশী, যথেষ্ট বেশী।একজন সামান্য একটা লেখায় চারটা বানানভুল করেছে, আবার একটা শব্দের বানান সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছে! তার মতে, ‘ইহুদী’ লেখা ঠিক নয়, ‘ইয়াহূদী’ লিখতে হবে।....

১৫ - ২ - ৪৫ হি. শুক্রবার:

কটু শব্দটার অর্থ কী! কড়া, রুক্ষ, কঠিন. পীড়াদায়ক (কটু কথা)। কটু মানে তীব্র, ঝাঁঝালো (কটু গন্ধ) একজন লিখেছে, ‘দিনরাত আমাকে কটু কথা শুনতে হয়, তবে আমি ছবর করি... খুব ভালো! আল্লাহ্ ছবরকারীর সঙ্গে আছেন। একই লেখায় একটু পরে আছে, ‘এমন কটুক্তি শুনে আর ছবর করা সম্ভব হলো না।...এটা কিন্তু ভালো হয়নি! না বানানের দিক থেকে, না আচরণের দিক থেকে। এখানে আর কটুক্তি নয়, বরং কট‚ক্তি। সূত্রটা হলো,  ু এবং  ু একত্র হলে   ূ হয়ে যায়। সুতরাং কটু এবং উক্তি, মিলে হবে কট‚ক্তি। একই ভাবে মরু ও উদ্যান মিলে হবে মরূদ্যান। ই ও ই মিলে হয় ঈ, যেমন রবি মানে সূর্য। ইন্দ্র মানে (হিন্দুমতে) স্বর্গের দেবরাজ। দু’টো মিলে যখন কোন হিন্দুর নাম হয়, তখন বানান হবে ‘রবীন্দ্রনাথ’।

১৮ - ২ - ৪৫ হি. সোমবার

আমার উম্মে মুহম্মদ মাঝে মধ্যে এমন বালাগাতের পরিচয় দেন যে, মুগ্ধ হতেই হয়। সবগুলো যদি একত্র করা যেতো, বেশ একটা কাজ হতো! সেদিন স্বভাবের বিপরীতে একটা শক্ত কথা বলে ফেললাম, আর ছোট্ট নাতীনের তিরস্কারের মুখে পড়লাম, নানুকে বকা দিলে কেন! বিব্রত হওয়ারই কথা, কিন্তু উম্মে মুহম্মদ বললেন, তোমার নানার বকা আমার জন্য বকুল ফুল!মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম, আর ভাবলাম, এ মানুষটির হাতে যদি কলম উঠলো না কেন!

১৯ - ২ - ৪৫ হি. মঙ্গলবার

মক্তবের একটি ছেলে লিখেছে, ‘সূর্যের আলো প্রখর, চাঁদের আলো ¯িœগ্ধ! রাতে চাঁদের আলো, আর দিনে সূর্যের আলো, দু’টোই আমাদের শান্তি দেয়...! কত উচ্চ চিন্তা এবং কী সুবিন্যস্ত প্রকাশ! ¯িœগ্ধ শব্দটি কত সহজে তার কলমে এসে গিয়েছে! বলা যায়, নিঃসন্দেহে সে তার বয়স থেকে এগিয়ে আছে।আল্লাহ্র রহমতে এ অগ্রযাত্রা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে...!

 ২০- ২ - ৪৫ হি বুধবার

একজন আবার রম্যরচনা পাঠিয়েছে। সঙ্গে অনুরোধ, ‘অনেক কষ্ট করে লিখেছি, আশা করি বেশী সম্পাদনা ছাড়া আমার লেখা আমার চেহারায় প্রকাশিত হবে।...কথাটি কিন্তু বেশ সুন্দর! ‘তার লেখা যেন তার চেহারায় প্রকাশিত হয়।’ এতটুকুর জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ তার প্রাপ্য। কিন্তু রম্য রচনার বিষয়ে যে উপদেশ দিয়ে আসছি, তা কেন কানে তোলা হচ্ছে না!পুষ্পের বিভিন্ন লেখা সম্পর্কে নিজের মতামত লেখা যায়, যা পাঠকের আদালতে ছাপা হতে পারে। রোযনামচা লেখা যায়। ছোট ছোট ভ্রমণকাহিনী লেখা যায়। পত্রপত্রিকায় ছোটদের পাতায় সুন্দর সুন্দর লেখা ছাপা হয়, কোন একটি লেখা সামনে রেখে নিজের মত সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা যায়। এমনকি অন্যভাষার কোন লেখা তরজমা করা যায়। এগুলো হচ্ছে লেখার চর্চা ও অনুশীলনের আদর্শ উপায়। 

২৩ - ২ - ৪৫ হি. শনিবার

এক পাঠিকা লিখেছেন, ‘হুযূরের এবারের পুষ্প থেকে একটা জিনিস শেখা হলো, ‘ব্যাপার’ শব্দটা...!পুষ্প তাহলে এখনো তার নিজের হলো না, হুযূরেরই রয়ে গেলো! কোন ছেলে এভাবে লিখলে এত কষ্ট হতো না।আচ্ছা, পুষ্প তাহলে শুধু কিছু শব্দ শেখায়! উন্নত চিন্তার আলো দেখায় না! উন্নত চরিত্রের সুবাস ছড়ায় না! অন্তত সম্পাদকীয় থেকে শেখার কিছু ছিলো না! এসম্পর্কে কি দু’চারটি বাক্য লেখা যেতো না!

২৬ - ২- ৪৫ হি. মঙ্গলবার

দশম সংখ্যার শেষকথার শুরুর দিকের একটি বাক্য দেখো, ‘সত্যের প্রতিধ্বনি রয়েছে আমার কণ্ঠে।’কথাটা এভাবেও বলা যেতো, ‘আমি সত্য কথা বলছি’, এটা হলো সাদামাটা কথা। যদি বলি, ‘আমার কণ্ঠে সত্য উচ্চারিত হয়েছে’ তাহলে প্রকাশটা আরো উন্নত হয়। পক্ষান্তরে ‘সত্যের প্রতিধ্বনি রয়েছে আমার কণ্ঠে’ এখানে অনেক উচ্চ ভাবের  প্রকাশ ঘটেছে। বোঝা যায়, দূর আকাশের ওপারে গায়ব থেকে যেন সত্য ধ্বনিত হয়েছে, আর সত্যের সেই ধ্বনি আমার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে! ঊর্ধ্বজগতের পরম সত্তার সঙ্গে অধঃজগতের মৃত্তিকাসত্তার যেন একপবিত্র বন্ধন সত্যকে অবলম্বন করে!

২৮ - ২ - ৪৫ হি. বৃহস্পতিবার

একই সংখ্যার শেষকথায় আছে, ‘যারা স্বস্তি, শান্তি ও আনন্দের কারণ, তাদের প্রতি তুমি কৃতজ্ঞ হবে, এটা তো স্বাভাবিক...! তিনটি শব্দের বিন্যাস দেখো, অন্যরকম বিন্যাসও পরীক্ষা করে দেখতে পারো।এখানে ‘যারা’ এর পরে ‘তোমার’ বা ‘তোমার জন্য’ থাকলে ভালো হতো কি না, চিন্তা করো।আরো দেখো, ‘তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হবে, এটা তো স্বাভাবিক।’ যদি বলা হতো, ‘তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া তো স্বাভাবিক।’ তাহলে গ্রহণযোগ্য হতো অবশ্যই, তবে ভাষা ও সাহিত্যের উচ্চমাত্রার সৌন্দর্য ক্ষুণœ হতো।‘উপকারী বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা (বোধ করা) মহত্ত¡ ও আভিজাত্যের প্রমাণ...। এখানে ‘বোধ করা’ অংশটি বাদ যেতে পারে। দুঃখজনক কথা হলো, ‘প্রমাণ’ এর পরে হবে ‘নয়’; অর্থাৎ উপকারী বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা মহত্ত¡ ও আভিজাত্যের প্রমাণ নয়। কারণ এটা হলো ভদ্রতার ন্যূনতম স্তর। কত গুরুতর ও লজ্জাজনক মুদ্রণভুল!

২৯ - ২ -৪৫ হি.

বড়ত্ব ও মহত্ত¡, কাঠামোগত দিক থেকে শব্দদু’টির দু’রকম বিন্যাসই হতে পারে। কারণ সমমাপের শব্দ। তবে মর্মগত দিক থেকে মহত্ত¡ ও বড়ত্ব, এ বিন্যাস ঠিক নয়, কারণ যিনি মহৎ তিনি বড় অবশ্যই, পক্ষান্তরে যিনি বড় তিনি মহৎ নাও হতে পারেন। আরবী বালাগাতে আমরা মিছাল পড়েছি, ‘ফাছীহুন বালীগুন’ কিন্তু বালীগুন ফাছীহুন’ নয়।আমাদের আরবী বালাগাতের পড়াগুলো যদি আমরা সার্থক-ভাবে বাংলা লেখায় প্রয়োগ করতে পারি তাহলে আমাদের বাংলা লেখাও সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে। কারণ ভাষা হতে পারে ভিন্ন এবং বিভিন্ন, তবে ভাষার অলঙ্কার মৌলিক-ভাবে অভিন্ন।

১- ৩ - ৪৫ হি.

একটি বাক্য দেখো, ‘কেউ তোমাকে স্বস্তি দেয়, কেউ তোমার বিরক্তি উৎপাদন করে।’এটা আমারই লেখা, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ত্রæটিপূর্ণ। প্রথমত ‘উৎপাদন’ শব্দটি কলকারখানা ও ক্ষেতখামারের শব্দ। আবেগমুখী লেখায় এটা বেমানান। দ্বিতীয়ত ‘স্বস্তি দেয়’ এর সঙ্গে  ‘উৎপাদন করে’, মনে হবে একটা হাত ছোট, আরেকটা হাত বড়। এটা যেমন দৃষ্টিকটু তেমনি শ্রæতিকটু। যদি লেখা হতো, ‘কেউ তোমাকে স্বস্তি দেয়, কেউ তোমাকে বিরক্ত করে’, তাহলে ভালো হতো।আবার  দেখো, ‘কেউ তোমাকে আনন্দ দেয়, কারো কাছ থেকে পাও ব্যথা ও যন্ত্রণা’। এখানে প্রথম অংশটি ছোট, দ্বিতীয় অংশটি বড়, ঠিকই আছে, কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যদিক থেকে। পাও শব্দটি, এখানে চিন্তা করে দেখো, কত শ্রæতিকটু! কেমন ছন্দপতন ঘটিয়েছে! যদি লেখা হতো, ‘কেউ তোমাকে আনন্দ দেয়, কেউ দেয় ব্যথা ও যন্ত্রণা (আঘাত ও যন্ত্রণা)। বেশ ভালো হতো। এভাবেও লেখা যায়, ‘কেউ তোমাকে আনন্দ  দেয়, কারো কাছ থেকে আসে ব্যথা ও আঘাত’।মোটকথা মনে হচ্ছে, গত সংখ্যার ‘শেষকথা’ লেখাটির লেখা এখনো শেষ হয়নি! 

৩ - ৩ - ৪৫ হি.

একটি বাক্য প্রথমে লিখেছিলাম, ‘কেউ তোমার হাতে ফুল তুলে দেয়।’এটা ‘কেউ তোমাকে ফুল দেয়’ এর চেয়ে ভালো।‘কেউ তোমার হাতে ফুল তুলে দেয়, কেউ তুলে দেয় কাঁটা’, একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ফুল কারো হাতে তুলে দেয়ার জিনিস, কিন্তু কাঁটা কারো হাতে তুলে দেয়ার জিনিস নয়। তাই সংশোধন করে লিখেছি, ‘কেউ তোমার হাতে ফুল তুলে দেয় কেউ দেয় কাঁটার আঘাত’ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য, তবে আরো ভালো হয়, ‘কেউ তোমার হাতে ফুল তুলে দেয়, কারো কাছ থেকে আসে কাঁটার আঘাত।’আরো ভালো হতো যদি লিখতাম, ‘তোমার চলার পথে কেউ ফুল বিছিয়ে দেয়, কেউ ছড়িয়ে রাখে কাঁটা!‘ফুল বিছানো’ যত সুন্দর, ‘কাঁটা বিছানো’ গ্রহণযোগ্য হলেও তত সুন্দর নয়। আসলে ফুল বিছানো হয়, কাঁটা ছড়ানো হয়। 

৭ - ৩-৪৫ হি.

বিশেষ করে পুষ্পের জন্য যারা লেখে, যারা সাহিত্যের সেবক হতে চায়, শব্দচয়ন সম্পর্কে তাদের অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। বস্তির শব্দ এবং বাজারের শব্দ তো তাদের কলমে মোটেই সঙ্গত নয়। একজন ভালো মানুষ বলেছেন, ‘বিয়ে খেতে গিয়েছিলাম, দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম। দাওয়াত খাওয়ার বিষয়টা একটু হয়ত বুঝি, কিন্তু আস্ত একটা বিয়ে মানুষ কীভাবে খেয়ে ফেলে, সত্যি বুঝতে পারি না। কত সুন্দর হয় যদি বলি, বিয়েতে/বিবাহে গিয়েছিলাম। অথবা শরীক হতে/যোগ দিতে গিয়েছিলাম। বিবাহে যোগ দিয়ে পোলাও কোর্মা যত ইচ্ছা খাও, অন্যের বিবাহটা খেতে যেয়ো না।

১০ - ৩ - ৪৫ হি.

একটি মেয়ে, বয়স বোধ হয় খুব বেশী না, লিখেছে, আমি আগে কান্না করতাম, এখন কান্না করি না। পুষ্প থেকে শিখেছি, মানুষ কান্না করে না, কাঁদে।চিঠিটি আমাকে বড় আনন্দ দিয়েছে।

 ১৩ - ৩ -৪৫ হি.

যত লেখা এসেছে, ৯৯ভাগ হলো রোযনামচা! ‘তোমাদের লেখা’ বিভাগের  জন্য কোন লেখা বলতে গেলে নেই!চিঠিপত্র বিভাগ, কলম হাতে নেয়ার কত সুন্দর সুযোগ। একটা চিঠিও আসেনি! পরে মাদরাসাতুল মাদীনার তালিবানে ইলমের কাছে ফরমায়েশ করে লেখা যোগাড় করেছি।তাহলে পুষ্পের লেখার বিষয়ে পাঠকের কাছ থেকে সাহায্য পাবো কীভাবে!

১৪ - ৩ - ৪৫ হি.

লেখার মোটামুটি চর্চা আছে, এমন কেউ যদি ইচ্ছা করে, প্রথম কথা, শেষ কথা, এ জাতীয় লেখাও লিখতে পারে। তাতেও যথেষ্ট উপকার হবে। একজন লিখেছেন ‘প্রথমকথা’, এর ছায়া অবলম্বন করে পুষ্পের আগামী সংখ্যার (দ্বাদশ) জন্য লেখার ইচ্ছা আছে। আল্লাহ্ তাকে উত্তম বিনিময় দান করুন, আমীন।

১৮ - ৩ - ৪৫ হি. 

দশম সংখ্যার ৮৭ পৃষ্ঠায় একটা গুরুতর ও লজ্জাজনক ভুল রয়ে গিয়েছে। লালকালিতে আলামত দিয়ে রেখেছিলাম, ‘এখানে লেখকের হাতের লেখা হবে, ‘অন্য বিন্ন’ ‘কিন্তু সম্পাদনার সময় নযর এড়িয়ে গিয়েছে। আসলে এমন ভুলের না কোন অজুহাত আছে, না কাফফারা!বয়স্ক ছেলে, লিখেছে, পুষ্প নাকি তার  কাছে মনে হয় ‘অন্ন, বিন্ন..আসল ঘটনা হলো, আমরা অনেকে ভাইকে বলি ‘বাই’; ভর্তাকে বলি ‘বর্তা’। তো মুখের শব্দ কলমেও এসে যায়। এই ছেলেটি একই চিঠিতে লিখেছে, ‘বাম ঘারানার মগজবেচা বুদ্ধিজীবীদের কাছেও...’ বলি কী, জীবনের শুরুতেই এমন আগ্রাসী, মারমুখী, ও উদ্ধত কলমচালনা খুবই অসঙ্গত।

২৩ - ৩ - ৪৫ হি.

আল্লাহ্র রহমতে আজ একটি আনন্দের উপলক্ষ ঘটেছে। পুষ্পের প্রতি সংবেদনশীল ও দরদী একজন পাঠক, তার প্রিয় পুষ্পকে বিজ্ঞাপনমুক্ত রাখার জন্য এবং অর্থমূল্য নির্ধারণের বিষয়ে বৈপ্লবিক চিন্তার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। সঙ্গে কিছু অর্থ হাদিয়া পাঠিয়েছেন, ‘পাঠকসমাজের পক্ষ হতে’। আল্লাহ্ তাকে...!আগামী সংখ্যা থেকে হয়ত কাগজ ও অর্থমূল্য সম্পর্কে বাধ্য হয়েই নতুন কিছু চিন্তা করতে হবে।

(চলবে ইনশাআল্লাহ্) 

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

অন্যান্য লেখা