রবিউল আউয়াল ১৪৪০হিঃ (৩/৭)

কাশগর/কায়রো

কেউ জানে না, উইঘোর বেঘোরে মরছে!!

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

চীন বহু যুগ থেকেই দখল করে রেখেছে বিশাল মুসলিম অঞ্চল পূর্বতুকিস্তান, যার বর্তমান নাম জিনজিয়াং, যেখানে বাস করে তুর্কী বংশধারার বিপুল জনগোষ্ঠী, যাদের বংশগত পরিচয় হলো উইঘোর মুসলিম, যাদের সংখ্যা এককোটি বিশলাখ।

যখন থেকে চীনে কমিউনিজমের আগ্রাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন থেকে চলছে, নিরীহ, শান্তিপ্রিয় এই মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর কমিউনিস্ট শাসনের নির্মম নির্যাতন। এ নির্যাতন বাড়তে বাড়তে এখন  জাতিগত উচ্ছেদ বা জাতিগত আত্মীকরণের রূপ ধারণ করেছে। ‘জাতিগত উচ্ছেদ’ মানে হলো সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য অংশকে তাদের যুগযুগের বাস্তুভিটা থেকে সরিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে অন্যত্র স্থানান্তর করা এবং খালি জায়গায় সংখ্যাগুরু হান জনগোষ্ঠীর বসতি গড়ে তোলা। এটাই করা হয়েছে এতদিন।

এখন শুরু হয়েছে জাতিগত আত্মীকরণের নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। যার অর্থ হলো, উইঘোর মুসলিম জনগোষ্ঠীকে হান নামে পরিচিত মূল চৈনিক জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে একীভূত করার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া, এমনকি নাম, পোশাক, ভাষা, নীতি ও নৈতিকতা, আচার-অনুষ্ঠান সববিষয়ে উইঘোর মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র পরিচয় মুছে ফেলা।

এই আত্মীকরণ কর্মসূচী ব্যাপক আকারে বহু আগেই শুরু হয়েছে। প্রথমে রোযা ও জুমা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এ অজুহাতে যে, এতে কর্মোদ্যমে ভাটা পড়ে এবং   জাতীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। কোন উইঘোর পরিবারে কোরআন ও ধর্মীয় গ্রন্থ রাখা এবং কিছু মুসলিম নাম রাখা এখন নিষিদ্ধ।

আন্তর্জাতিক সংবাদ-মাধ্যমে এসব খবর এত দিন কোন গুরুত্ব পায়নি। তাই চীনা কর্তৃপক্ষের জন্য কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

সম্প্রতি চীনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য-য্দ্ধু শুরু হওয়ার ফলে চীনবিরোধী    প্রচারণার অংশরূপে উইঘোর নির্যাতনের খবর বিশ্ব-গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিসঙ্ঘও দেখা যায়, উইঘোর মুসলিমদের বিষয়ে আরাকান-ট্রাজেডির চেয়ে অধিক সোচ্চার।

প্রথমে যে গুরুতর খবর প্রকাশিত হয়েছে তা হলো, ১০ লাখ উইঘোর মুসলিমকে বড় বড় শিবিরে জোরপূর্বক আটকে রেখেছে চীনাকর্তৃপক্ষ। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন উপায়ে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। গত আগস্ট মাসে জাতিসঙ্ঘের একটি কমিটি তাদের প্রস্তুতকৃত রিপোর্টে এ তথ্য জানিয়েছে।

শুরুতে চীন এসব অভিযোগ ¯্রফে অস্বীকার করে এসেছে। তবে সম্প্রতি নির্যাতনের গোপন বন্দিশিবিরগুলোকে আইনী বৈধতা দিয়ে বলা হচ্ছে, ‘এগুলো আসলে ‘সংশোধন-শিবির’। উইঘোর সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় চরম পন্থা ও জঙ্গিবাদের ক্রমবর্ধমান বিস্তার রোধ করার জন্যই এসব শিবির খোলা হয়েছে, এগুলো বন্দীশিবির মোটেই নয়।’

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এত ‘সুন্দর’ যুক্তিও জাতিসঙ্ঘের কাছে এখানে গ্রহণযোগ্য নয়! জাতিসঙ্ঘ বরং জোরালোভাবে এ দাবী প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, জোরপূর্বক আটকে রাখা - যে কোন যুক্তিতেই হোক - মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। যুক্তরাষ্ট্রও উইঘোর মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমালোচনা-মুখর হয়েছে, যদিও ফিলিস্তীনে ইসরাইলি ও ইহুদি সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

জাতিসঙ্ঘ মহাসচীব তার সর্বশেষ বিবৃতিতে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অবিলম্বে সমস্ত বন্দীশিবির বন্ধ করার এবং নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সকল প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকার। চীন অবশ্য মার্কিন প্রশাসনের নিন্দা সমালোচনা এবং জাতি -সঙ্ঘের উদ্বেগ আহ্বান, এগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। কারণ আমেরিকা নিজেও জানে, ইসরাইল ও ইহুদি সন্ত্রাসকে কীভাবে এ পর্যন্ত সে ভেটোর ছত্রচ্ছায়া দিয়ে এসেছে।

একই ভাবে জাতিসঙ্ঘ মহাসচীবেরও অজানা নেই। নিরাপত্তা পরিষদের কোন স্থায়ী সদস্যকে কোন বিষয়ে আহ্বান জানানো কতটা অর্থহীন।

সম্প্রতি গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানা যায়, মুসলিমপ্রধান জিনজিয়াং প্রদেশে হালাল-বিরোধী ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে চীনের কমিউনিস্ট প্রশাসন। এটাকে বলা হচ্ছে ‘হালালবাদ’র ছদ্মাবরণে ধর্মীয় চরম পন্থা চর্চার বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াই।      উল্লেখ্য, ইসলামের জীবন-বিধানে পানাহার ও পোশাক এবং অন্যান্য বিষয়ে যা কিছু অনুমোদিত তা হালাল এবং  যা কিছু নিষিদ্ধ তা হারাম। হালাল-হারাম মেনে চলা মুসলিম সম্প্রদায়ের মানবিক ও ধর্মীয় অধিকার। কিন্তু চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের উদ্ভট যুক্তি হলো, হালাল মোড়কজাত পণ্যের প্রতি আকর্ষণ যত বৃদ্ধি পাবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার প্রবণতা সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পেতে থাকবে, যা ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষ জীবনের সীমানাকে ধীরে ধীরে একেবারে মুছে ফেলবে। এর অনিবার্য পরিণতি হবে ধর্মীয় উগ্রবাদিতার ভয়াবহ বিস্তার, যা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না। 

অতি সম্প্রতি সবচে’ ভয়াবহ যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো, কমিউনিস্ট প্রশাসন অধিকতর সচ্ছল ও আধুনিক প্রতিপালন ও শিক্ষাদানের নামে উইঘোর পরিবারগুলো থেকে অল্প বয়স্ক ছেলে মেয়েদের জোরপূর্বক সরকারী শিশুনিবাসলোতে নিয়ে যাচ্ছে। উইঘোর সম্প্রদায়ের অসহায় মা-বাবা বুকফাটা

আহাযারি ও আর্তনাদ ছাড়া কিছুই করতে পারছে না। ঘরে ঘরে তাই শুরু হয়েছে সন্তান হারানোর মাতম।

উইঘোর সম্প্রদায়ের নামসর্বস্ব মুসলিম, যারা ইতিমধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছে তাদের মাধ্যমে জোর প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে, কী কারণে সংশোধন শিবিরে যাওয়া তাদের জন্য জরুরি। তদ্রƒপ কী কারণে শিশুদের সরকারী শিশুনিবাসে প্রেরণ তাদের জন্য কল্যাণকর।

আফসোস, মুসলিমবিশ্ব, এমনকি মুসলিম বিশ্বের দ্বীনদার সমাজ ওলামা তবকা উইঘোর মুসলিম সম্প্রদায়ের করুণ অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর!

প্রতিটি মুসলিম দেশ, বা বিশ্বের সকল মুসলিম জনগোষ্ঠী যদি প্রতিবাদে সোচ্চার হতো তাহলে হয়ত এ অসহায় জনগোষ্ঠী কিছুটা হলেও সুরক্ষা লাভ করতো। কিন্তু

এখানেও দেখা যায় একই দৃশ্য, মাঝে মধ্যে একমাত্র তুরস্ক ও তার নেতা রজবতৈয়ব এরদোগান প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। অন্যদিকে সউদী ক্রাউন প্রিন্স চীনসফরে গিয়ে  ঘটা বিপুল বাণিজ্যিক চুক্তি উপহার দিয়ে এসেছেন। জিনজিয়াং প্রদেশ সফর করা তো দূরের কথা, তাদের খোঁজ-খবর নেয়ারও গরজ বোধ করেননি। আসলে উইঘোর মুসলিমানের এ ঘোর দুর্দিনে তাদের পাশে দাড়াবার কেউ নেই। দুনিয়াতে তাদের এখন আল্লাহ ছাড়া কোন রক্ষাকারী নেই।

 

 

হে মুসলিম উম্মাহ! আমাদের আকুতি শোনো! আমরা তো তোমাদেরই অংশ! আমাদের না হোক, আমাদের সন্তানদের ঈমান আকীদা রক্ষার জন্য অন্তত এগিয়ে আসো। আমাদের সবই গিয়েছে, প্রজন্মের ঈমানের যেন হেফাযত হয়।

-উইঘোর রাইটস মুভমেন্ট

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

অন্যান্য লেখা