রবিউছ ছানী ১৪৪৫ হিঃ

কাশগর ও কায়রো

এরদোগানের স্বপ্ন, পশ্চিমাদের দুঃস্বপ্ন

ইস্তাম্বুলের নতুন খাল!

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

এরদোগানের স্বপ্ন, পশ্চিমাদের দুঃস্বপ্ন

ইস্তাম্বুলের নতুন খাল!

শিরোনামের আলোচনায় যাবো, একটি প্রশ্নের মাধ্যমে যার অনুক‚লে যুক্তিসঙ্গত কোন ব্যাখ্যা আমার জানা নেইÑ কোন কোন মুসলিম শাসক, আমেরিকার কড়া সমালোচক, অথচ তাদের সঙ্গেই ‘মার্কিন হুযূরের সমস্ত দোস্তি-সেলফি’! পক্ষান্তরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশে^র সঙ্গে সংযমপূর্ণ রাজনৈতিক, ক‚টনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলার চেষ্টা করছেন, অথচ শুরু থেকেই তিনি আমেরিকারÑ প্রেসিডেন্ট যিনিই হনÑ তার চক্ষুশূল এবং পশ্চিমাদের চোখের কাঁটা!কী এর কারণ! কোথায় এর রহস্য! আলোচনার বিস্তার হতে পারে বহুমুখী ও বহুদূর। তবে এখন আমরা ইস্তাম্বুলের নতুন খালখননপ্রকল্প সম্পর্কেই শুধু আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। বিশে^র রাজনীতি ও ক‚টনীতির অঙ্গনে যারা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক তারা বলেন, ইস্তাম্বুলখাল হচ্ছে এরদোগানের বহু দিনের স্বপ্ন, আর আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশে^র দুঃস্বপ্ন। কারণ এ খালখননপ্রকল্পের সফলতার মধ্যেই এরদোগান দেখতে পাচ্ছেন তুরস্কের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সোনালী ভবিষ্যত। পক্ষান্তরে পশ্চিমাদের দুঃস্বপ্নের কারণ এই যে, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু এরদোগানের তুরস্কই নয়, বরং ভবিষ্যত প্রজন্মের তুরস্কও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে যাবে এবং পাশ্চাত্যের ছোবল-কবল থেকে চিরদিনের জন্য মুক্ত হয়ে যাবে।পশ্চিমা শক্তি এবং তুরস্কের ভিতরে তাদের তাবেদার গোষ্ঠী গত নির্বাচনে এরদোগানের পরাজয়ের জন্য যে উঠে পড়ে লেগেছিলো তার পিছনে অনেক কারণের একটি হলো এই ইস্তাম্বুল -খালখননপ্রকল্প, যার সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে বহু আগে!

ইস্তাম্বুল খালখননের চিন্তা নতুন কিছু নয়

তুরস্কের অবিসংবাদিত নেতা এরদোগান ও তার জনগণের মধ্যে ইস্তাম্বুলখালখননের যে স্বপ্ন দানা বেঁধেছে তা কিন্তু আজকের নতুন কোন স্বপ্ন নয়। পিছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, এর প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং উদ্যোগও নিয়েছিলেন উছমানী সালতানাতের দূরদর্শী সুলতান সোলায়মান (১৫২০Ñ৬৬)। তুর্কী পত্রিকা হুররিয়াতের মতে সোলায়মানের যুগের বিখ্যাত স্থপতি মি’মার সিনানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো প্রকল্পের নকশা তৈরীর, যা তিনি সম্পন্ন করেওছিলেন, যা অজ্ঞাত কারণে বাতিল হয়ে যায়। তারপর থেকে বিগত পাঁচশ বছরে অন্তত দশবার এ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, কিন্তু ভিতরের ও বাইরের শক্ত প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন অনিবার্য সীমাবদ্ধতার কারণে এ স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। সুলতান তৃতীয় মুরাদের আমলে (১৬৯১ সালের ৬ই মার্চ) খালখননের বিষয়ে রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়, তাও বাদ পড়ে যায়।সুলতান মাহমূদ দ্বিতীয় (১৮০৮Ñ৩৯) উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু জ্ঞাত অজ্ঞাত বিভিন্ন কারণে তাও আলোর মুখ দেখেনি। এটাই ছিলো উছমানী আমলের সর্বশেষ উদ্যোগ।দীর্ঘ পাঁচশতাব্দী পর আধুনিক তুরস্কের প্রকৃত রূপকার রজব তাইয়েব এরদোগান, পাশ্চাত্য যাকে উপহাস করে বলে সুলতান এরদোগান, তিনি এই খাল-খননের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ২০১১ সালের ২৬ শে জুলাই। সময় নির্ধারণ করেন ছয়বছর|

তুরস্ক তথা ইস্তাম্বুলের ভৌগোলিক অবস্থান

আঞ্চলিক পর্যায়ে এবং বিশ^পর্যায়ে ইস্তাম্বুল-খালপ্রকল্পের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ঠিকমত বুঝতে হলে আগে আমাদের সংক্ষেপে হলেও জানতে হবে তুরস্ক ও ইস্তাম্বুলের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে। আমরা জানি, আধুনিক তুরস্কের পুরো ভ‚খÐটি ইউরোপ ও এশিয়া দুই মহাদেশে অবস্থিত, যার কারণে একে বলা হয় দ্বিমহাদেশীয় (নর-পড়হঃরহবহঃধষ) রাষ্ট্র। একই কারণে বলা হয় ইউরেশিয় (বা ইউরোপ ও এশিয়ার মিলিত) দেশ। তুরস্কের মোট আয়তন ৭৮৩৩৫৬ (সাতলাখ তিরাশি হাজার তিনশ ছাপ্পান্ন) বর্গমাইল। ভ‚খÐের প্রায় সবটুকু (৯৭ ভাগ) পশ্চিম এশিয়ার আনাতোলিয়ায় অবস্থিত, পক্ষান্তরে সামান্য কিছু অংশ (৩ ভাগ) দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের পূর্ব থ্রেসে অবস্থিত। দেশের জনসংখ্যা ৮ কোটি ৩৬ লাখ, যার ৮৬ ভাগ এশীয় অংশে, আর ১৪ ভাগ বাস করে ইউরোপীয় অংশে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে গ্রিস ও বুলগেরিয়া, উত্তরে কৃষ্ণসাগর, উত্তর-পূর্বে জর্জিয়া, পূর্বে আরমেনিয়া, আজরবাইজান ও ইরান, দক্ষিণপূর্বে ইরাক, দক্ষিণে সিরিয়া ও ভ‚মধ্যসাগর এবং পশ্চিমে এজিয়ান সাগর অবস্থিত।মধ্যআনাতুলিয়ার আঙ্কারা তুরস্কের রাজধানী হলেও, এর সবচে’ বড় শহর হচ্ছে ইস্তাম্বুল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব রাজধানী আঙ্কারার চেয়ে বেশী। ইস্তাম্বূল দীর্ঘ বহু শতাব্দী উছমানী সালতানাতের রাজধানী ছিলো, যা পূর্বে কনস্টান্টিনোপল নামে বাইজান্টাইন সা¤্রাজ্যের রাজধানী ছিলো। সুতরাং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকেও এটি তুরস্কের শীর্ষশহর।ইস্তাম্বুল শহরের একটি অংশ এশিয়ায় এবং একটি অংশ ইউরোপে অবস্থিত। সম্ভবত এটিই পৃথিবীর একমাত্র শহর যার বিস্তার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ মহাদেশে। তুরস্ক ও ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশকে ইউরোপীয় অংশ থেকে বিভক্ত করেছে অতি সঙ্কীর্ণ একটি জলপথ, যা বসফরাস প্রণালী নামে পরিচিত। এই প্রণালীর মাধ্যমেই কৃষ্ণসাগর ও মার্মারাসাগর পরস্পর যুক্ত হয়েছে। মার্মারাসাগরের সঙ্গে আবার ভ‚মধ্যসাগর ও এজিয়ান সাগরকে যুক্ত করেছে একটি ক্ষুদ্র প্রণালী, যা দার্দাানিল প্রণালী নামে পরিচিত। তার মানে, বসফরাস ও দার্দানিল, এ দু’টি ক্ষুদ্রপ্রণালী আসলে মার্মারা থেকে শুরু করে কৃষ্ণসাগর, ভ‚মধ্যসাগর ও এজিয়ানসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পুরো সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করছে, আর প্রণালীদু’টি নিয়ন্ত্রণ করছে এককালের উছমানী সালতানাত, বর্তমানের তুরস্ক।মোটকথা, কৃষ্ণসাগর ও ভ‚মধ্যসাগরের মধ্যে যাতায়াত-কারী সমস্ত জাহায বসফরাস ও দার্দানিল প্রণালীর উপর বিকল্প -হীনভাবে নির্ভরশীল। তারপরো বিশ^রাজনীতির নির্মম পরিহাস এই যে, সুপ্রসিদ্ধ সুয়েজখাল দ্বারা মিসর অর্থনৈতিকভাবে যে পরিমাণ লাভবান হচ্ছে তাতে সুয়েজকে বলা হয় মিসরের অর্থনীতির মেরুদÐ। পক্ষান্তরে বসফরাস প্রণালী দিয়ে সুয়েজের তিনগুণ বেশী জাহায চলাচল করা সত্তে¡ও তুরস্কের অর্থনীতিতে তার ভ‚মিকা শূন্যের কোঠায়। কারণ এ পথে চলাচলকারী জাহায তুরস্ককে কোন শুল্ক প্রদান করে না এবং করতে তারা বাধ্য নয়।কী এর কারণ, জানতে হলে কিছুদূর পিছনে ফিরে যেতে হবে, আমাদের।প্রথম বিশ^যুদ্ধের কালো মেঘ তখন পুরো ইউরোপের উপর ছেয়ে আছে। ভিতর থেকে ও বাইরে থেকে বিচিত্রসব চক্রান্তের শিকার সুলতান আব্দুল হামীদখান বহুবছর থেকে এমন একটি পরিবেশ পরিস্থিতির প্রতীক্ষায় ছিলেন, যখন ইউরোপ নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে শেষ হবে, আর উছমানী খেলাফত নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে যুদ্ধের পুরো ফসল নিজের ঘরে তোলবে!কিন্তু চক্রান্তকারীরাই শেষ পর্যন্ত সফল হলো। খেলাফতের পদ থেকে তিনি অপসারিত হলেন এবং নব্যতুর্কীরা সদম্ভে ক্ষমতার মঞ্চে বিরাজমান হলো। খেলাফত অবশ্য তখনো নামমাত্র বাকি ছিলো। ঐ সময় নব্যতুর্কীরা ক্ষমতাচ্যুত সুলতানের সমস্ত অনুরোধ উপেক্ষা করে, জার্মানীর পক্ষে প্রথম বিশ^যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দিলো, তুরস্কের জন্য যা ছিলো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তারমধ্যে আবার বৃটেনের প্ররোচনায় খেলাফতের বিরুদ্ধে আরবদের বিদ্রোহ ও বিশ^াসঘাতকতা যুক্ত হলো। ফলে যুদ্ধ শেষ হলো তুরস্কের শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে! মুমূর্ষু উছমানী খেলাফত খÐ খÐ হয়ে তার গর্ভ থেকে জন্ম নিলো মুসলিম-অমুসলিম মিলিয়ে পঁয়তাল্লিশটি নতুন রাষ্ট্র।এদিকে মুস্তফা কামাল পাশা, যিনি ভিতর থেকে খেলাফাতকে শেষ করার চক্রান্তে প্রথম কাতারে ছিলেন, শেষ পর্যায়ে তিনি তার শাসনাধীন আধুনিক তুরস্কের স্বার্থ চিন্তা করে মিত্রশক্তির হাত থেকে কিছু এলাকা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে লড়াই শুরু করেন এবং কিছুটা সফল হন। ফলে খুব সস্তায় তুরস্কে তিনি এমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেন যে, তাকে বলা হলো আতাতুর্কÑ তুরস্কের পিতা।পরিস্থিতির এই প্রেক্ষাপটে ২৮শে অক্টোবর বিজয়ী মিত্রশক্তির পক্ষ হতে তুরস্ককে ডাকা হলো তথাকথিত শান্তিচুক্তির জন্য। ডাকা হলো কামালের তুর্কী সরকারকে এবং নামেমাত্র খলীফাকে। পশ্চিমারা আবার চেহারার উপর ন্যায়পরতার ‘আবরণ’ রাখতে পছন্দ করে! যুদ্ধের ঘোষণা তো এসেছিলো খেলাফতের পক্ষ হতে, তাই খলীফাকেও বৈঠকে উপস্থিত রাখাকে তারা নীতিগতভাবে জরুরি মনে করলো, তবে কিনা পর্দার আড়ালে কামালকে মন্ত্রণা দেয়া হলো, এখনই সময় খেলাফতের পিঠে ছুরি বসানোর, আর তিনি শান্তিচুক্তির বৈঠক শুরু হওয়ার সামান্য আগে খেলাফতকে বিলুপ্তি ঘোষণা না করলেও ‘অকার্যকর’ করলেন। ফলে খলীফার অংশগ্রহণের কোন প্রয়োজন থাকলো না। এ কারণেই আল্লামা ইকবাল পাশ্চাত্যকে বলেছেন ধূর্ত, আর কামালকে বলেছেন ‘নাদান তুর্কী’। ২০ শে নভেম্বর ১৯২২ সালে শুরু হলো শান্তি আলোচনা। দীর্ঘ আটমাস ধরে আলোচনা ও দরকষাকষির প্রহসন শেষে ২৪ শে জুলাই ১৯২৩ সালে তথাকথিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলো সুইজারল্যান্ডের লূযান শহরে, ফলে চুক্তির নাম হলো লূযানচুক্তি।

লূযানচুক্তি ও বসফরাস প্রণালীর কর্তৃত্ব নির্ধারণ

লূযানচুক্তির বিস্তারিত আলোচনা তো এখানে উদ্দেশ্য নয়, তাই চুক্তির সবচে’ অবিচারমূলক দফা ‘বসফরাস প্রণালী’ সম্পর্কেই শুধু বলছি। বসফরাস ও দার্দানিল প্রণালী দিয়ে জাহাযচলাচল নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে লূযান-চুক্তিতে একটি আন্তর্জাতিক কমিটি করার সিদ্ধান্ত হলো। ঐ কমিটিতে তুরস্ক সদস্যপদ পাবে, তবে তা হবে সম্পূর্ণ কর্তৃত্বহীন। প্রণালীদু’টির উভয়পাশর্^ হবে অস্ত্রমুক্ত এলাকা, অর্থাৎ তুরস্ক সেখানে সশস্ত্র প্রহরীদলও নিযুক্ত করতে পারবে না। তা না হয় হলো, কিন্তু তুর্কীপ্রতিনিধিকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো, এ পথে যাতায়াতকারী কোন জাহায থেকে তুরস্ক কোনপ্রকার শুল্ক আদায় করতে পারবে না! জি¦, আপনি ঠিকই পড়েছেন, তুরস্কের নৌপথ ব্যবহার করবে বিদেশী জাহায কোন প্রকার শুল্ক না দিয়ে! মেনে না নিয়ে উপায় কী! খেলাফতের মসনদ থেকে অপসারিত সুলতান আব্দুল হামীদ নব্যতুর্কীদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার যে অনুরোধ করেছিলেন, যদি তা রক্ষা করা হতো! যিনি বলেছেন সত্য বলেছেন, যাদের হাতে জাতির নিয়ন্ত্রণ তাদের কোন ভুল সিদ্ধান্ত, বা সঠিক সিদ্ধান্ত জাতিকে ইতিহাসের পথে এগিয়ে নেয়, বা ইতিহাসের মহাযাত্রা থেকে ছিটকে ফেলে।১৯৩৬ সালে অবশ্য পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে অপেক্ষাকৃত সহনীয় একটি চুক্তি করা হয় মন্ট্রেক্সচুক্তি নামে, তবে সেখানেও রাজস্ব আদায়ের কোন ব্যবস্থা ছিলো না।

বসফরাস প্রণালীর গুরুত্ব

ইস্তাম্বুলখালখননের প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য বসফরাস প্রণালীর গুরুত্ব সম্পর্কেও কিছু ধারণা থাকা দরকার। বসফরাস প্রণালী কৌশলগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের নয়টি দেশের জন্য সমুদ্রপথে আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রীকা যাওয়ার একমাত্র পথ হলো বসফরাস প্রণালী। এমন গুরুত্বপূর্ণ যে নৌপথ, ষোড়শ শতকের পর থেকেই উছমানী খেলাফত ঐ নৌপথসহ সমগ্র কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের উপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলো। তারপর থেকে এর দখল লাভের জন্য বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়েছে। ১৮৭৭-৭৮ সালে রাশিয়ার সঙ্গে উছমানীয়দের ঘোরতর যুদ্ধ ছিলো তার একটি। ইস্তাম্বুল ও বসফরাস প্রণালী উছমানীয়দের দখলে চলে যাওয়ার কারণে বিশে^র বাণিজ্যিক শক্তিগুলো বিকল্প নৌপথ খুঁজতে শুরু করে, কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত তখনকার বৃহৎ শক্তিগুলো যুদ্ধের পথ বেছে নেয়।বসফরাস প্রণালীর দৈর্ঘ্য ৩০ কিলোমিটার (১৯ মাইল), উত্তরের প্রবেশমুখে সর্বোচ্চ প্রশস্ত অংশটি প্রায় পৌনে চার কিলোমিটার। পক্ষান্তরে মাঝামাঝি অংশে সর্বনি¤œ প্রশস্ততা হচ্ছে মাত্র ৭৫০ মিটার। এর গভীরতা সবনি¤œ  ৩৬ মিটার থেকে সর্বোচ্চ ১২৪ মিটার।বৈশি^ক তেলবাণিজ্যেরও অতি গুরুত্বপূর্ণ রুট এটি। প্রধানত রাশিয়া থেকে এবং কৃষ্ণসাগরের উপক‚লীয় দেশগুলো থেকে বহু তেলবাহী জাহায প্রতিদিন এ প্রণালী দিয়েই বিশে^র বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। প্রতিদিন গড়ে ৩ মিলিয়ন বা ত্রিশ লাখ ব্যারল তেল এ পথ দিয়ে আনা নেয়া করা হয়।১৯৩০ এর দশকে চলাচলকারী জাহাযের সংখ্যা ছিলো বছরে মাত্র তিনজাহার। বর্তমানে প্রতি -বছর বিশাল আকারের প্রায় ৪৮ হাযার মালবাহী জাহায এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে, যার ফলে এখনই প্রণালীটি বিশে^র ব্যস্ততম নৌপথের একটি হয়ে উঠেছে।এই শতকের মাঝামাঝি, বা ২০৫০ সালের দিকে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৭৮ হাযার। অথচএখনি নৌজট বসফরাসের নিয়মিত বিষয়। এ জন্য কোন কোন জাহাযকে তিন থেকে চারদিনও সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়। তাছাড়া বিভিন্ন সময় বড় বড় জাহায-দুর্ঘটনাও ঘটেছে।

ইস্তাম্বুলখালখননের পক্ষে যুক্তি 

 প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সম্প্রতি ইস্তাম্বুল খালখননপ্রকল্পের পুনঃউদ্বোধন করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান। এই প্রকল্পের পক্ষে যুক্তি হিসাবে এরদোগান ও তার একেপি সরকারের বক্তব্য হলো, এর মাধ্যমে বসফরাসের নৌজট অনেকাংশে কমে যাবে এবং নৌচলাচল নিরাপদ হবে। তাছাড়া জাহাযগুলো ইস্তাম্বুলের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে সরে যাবে, ফলে জনস্বাস্থ্যের হুমকি কমে যাবে।জাহাযগুলোর জন্য বাড়তি সুবিধা হলো সময়ের সাশ্রয়। কারণ মার্মারাসাগর থেকে কৃষ্ণসাগরে প্রবেশের ক্ষেত্রে সময় অনেক কমের যাবে। সবচে বড় কথা, তুর্কী জলসীমা দিয়ে বিশে^র জাহাযচলাচলের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে এবং তুরস্ক বৈদেশিক মুদ্রায় বিপুল পরিমাণ শুল্ক আদায় করতে পারবে, যা তুরস্কের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাছাড়া প্রস্তাবিত এই খালকে ঘিরে উভয় পারে গড়ে ওঠবে সুবিশাল আধুনিক আবাসিক এলাকা।

এরদোগানবিরোধীদের অবস্থান

এই খালের বিরোধিতায় প্রবল-ভাবে নেমেছে তুরস্কের বিরোধী-দল। পুরো নির্বাচনী প্রচারণায় তারা এর বিরোধিতায় সর্বশক্তি নিযুক্ত করেছিলো। এমনকি এই প্রকল্পে যারা বিনিয়োগ করবে তাদের হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, বিরোধীদল ক্ষমতায় গেলে বিনিয়োগকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং তাদের বিনিয়োগ বাজেয়াপ্ত করা হবে। কিন্তু গণরায় গিয়েছে তাদের বিপক্ষে, এরদোগানের পক্ষে। সুতরাং গণতন্ত্রের ভাষায় বলা যায়, বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, গণতন্ত্রের প্রতি যারা ‘লবেজান’, গণরায় বিপক্ষে গেলেই গণতন্ত্রের ভাষা তারা হারিয়ে ফেলেন। তবু মনে হয় এখানে তাদের যুক্তিগুলো সম্পর্কেও কিছু বলা ভালো।তাদের প্রধান যুক্তি হলো, বসফরাস প্রণালী তো আছেই, যা দিয়ে জাহায আসাযাওয়া করছে (তবে বিনাশুল্কে!)। সুতরাং এত বিপুল পরিমাণ ভ‚মির অপচয় ঘটিয়ে নতুন খালখননের প্রয়োজন কী!আচ্ছা, তাদের কি জানা নেই যে, সকল আন্তর্জাতিক জরীপ অনুযায়ী বসফরাসের নিরাপদ নৌচলাচলের সর্বোচ্চ পরিমাণ হলো বছরে পঁচিশ হাযার জাহায, অথচ এখনই জাহায পারাপারের পরিমাণ আটচল্লিশ হাযার এবং সামনে এর পরিমাণ আরো বাড়বে। এছাড়াও দৈনিক লাখ লাখ মানুষ পার হয় ফেরিযোগে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এখনই সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এটা শুধু ধারণাভিত্তিক কথা নয়, বাস্তবতাও তাই। গত তিনবছরে ছোট বড় পঞ্চাশটির মত দুর্ঘটনা বসফরাস প্রণালীতে ঘটে গিয়েছে। সবচে’ বড় দুর্ঘটনাটার কথাই বলি, যা ঘটেছিলো ১৯৭৯ সালে। ছিয়ানব্বই হাযার টন তেল বহনকারী একটি তেলট্যাঙ্কার দুর্ঘটনাকবলিত হয়। ফলে সমস্ত তেল বসফরাসের পানিতে ছড়িয়ে পড়ে, যা ভয়ঙ্কর পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ ছিলো। ট্যাঙ্কারের ক্রুদের মধ্যে ৪৩জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। .....এধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ২০১৯ সালের দুর্ঘটনাও এক্ষেত্রে স্মরণ করা যায়। আমাদের প্রশ্ন, বিরোধীরা এবং তথাকথিত পরিবেশবাদীরা এ বিষয়টা কেন বিবেচনায় আনছেন না! তারা যে পরিবেশদূষণের দোহাই দিচ্ছেন তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই তো বিকল্প পথের প্রয়োজন!বিরোধীদের আরো যুক্তি, খালখননে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, প্রায় পনেরশ বিলিয়ন ডলার, তা কোত্থেকে আসবে? এমনিতেই তো দেশের অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয়। বিদেশী বিনিয়োগ দ্বারা তো দেশ যিম্মী হয়ে পড়বে।বিরোধীদের এতদিনের সমালোচনা  কিন্তু ছিলো এই যে, সরকার বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারছে না। এখন বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগে দেশ যিম্মী হওয়ার কথা! এমন অবাক করা স্ববিরোধিতা সম্পর্কে কী বলা যায়! মোটকথা, তুরস্ক তার নিজস্ব অর্থায়ন থেকেই এ প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারে। দেশে বড় বড় কোম্পানি বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত, যাদের তারা হুমকি দিয়ে ফিরিয়ে রাখতে চাচ্ছেন! তাছাড়া রয়েছে যিম্মী হওয়ার আশঙ্কা ছাড়াই বিদেশী বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা।বিরোধীদের আরো হাস্যকর যুক্তি, এ প্রকল্প সম্পন্ন হতে লাগবে কমপক্ষে দশবছর। তা থেকে আসবে কোটি কোটি টন মাটি, যা বহন করে দূরে কোথাও ফেলার জন্য ব্যবহার করতে হবে হাজার হাজার ট্রাক! তো মাটি খনন থেকে মাটি বহন, এই পুরো কর্মকাÐের কারণে সৃষ্টি হবে ভয়ঙ্কর বায়ুদূষণ ও পরিবেশবিপর্যয়। তাছাড়া হাযার হাযার ট্রাকের বহর যখন আসা যাওয়া করবে তখন ইস্তাম্বুলের ট্রাফিক  পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে।....কেউ যদি বলে এরা আসলে জ্ঞানপাপী এবং তুরস্কের শত্রæদের সেবাদাস, তাহলে কি অন্যায় বলা হবে! এদের কথা কি তাহলে এই যে, পৃথিবীতে কোথাও জন-কল্যাণের জন্য মাটিখনন ও মাটিবহনের কাজ হবে না!এরদোগান তবু শান্ত ভাষায় বুঝিয়েছেন, বায়ুদূষণ সর্বনি¤œ পর্যায়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যেমন ট্রাকবহর যাতায়াত করবে পাশর্^সড়ক দিয়ে। এজন্য প্রকল্প শুরুর আগেই তৈরী করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় পথ ও পোল। আর বিপুল পরিমাণ মাটি খুব বেশী দূরে নেয়া হবে না, বরং তা ব্যবহার করা হবে খালের তীরবর্তী জনপদ গড়ে তোলার কাজে। তদুপরি কৃষ্ণসাগরের কিছু অংশ ভরাট করে একটি কৃত্রিম বন্দর নির্মাণ করা হবে, যা অর্থনীতির চাকা শুধু সচলই করবে না, বরং সুদূরপ্রসারী সুফলও বয়ে আনবে।বিরোধীদের আরো যুক্তি, এই খালখনন-প্রকল্পের কারণে মার্মারাসাগরের জীব-বৈচিত্র ও জলজ প্রাণী শেষ হয়ে যাবে। কারণ কৃষ্ণসাগর ও মার্মারার পানির তাপমাত্রায় পার্থক্য অনেক। তাছাড়া পানির উচ্চতা ও লবণাক্ততার মধ্যেও রয়েছে পার্থক্য। ফলের উভয় পানির মিশ্রণ দ্বারা ঐ অঞ্চলের জলজপ্রাণীর জীবন হুমকির মুখে পড়বে।বাহ্যত মনে হয়, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের চিন্তা  থেকে যুক্তিটির জন্ম ও বেশ ওজনদার। তবে বিশেষজ্ঞ মহোদয়ের জানা দরকার, দুই সাগরের পানি তো বসফরাস প্রণালীর মাধ্যমে আগেই যুক্ত হয়ে আছে! তাতে তো...! বরং বসফরাস প্রণালীতে জাহাযদুর্ঘটনা যতবার ঘটেছে, ততবার জলজপ্রাণী ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে, যা ভবিষ্যতে আরো কঠিন হতে পারে।ইস্তাম্বুল শহরের অধিবাসীদের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়ার মত একটা যুক্তি হলো, এই প্রকল্পের কারণে ইস্তাম্বুলে খাবার পানির সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। কারণ প্রস্তাবিত এই খালের গতিপথে পড়বে বেশ ক’টি জলাধার, যা ইস্তাম্বুলে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত-¡পূর্ণ ভ‚মিকা রাখে।ভাবতে অবাক লাগে, এই যুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এমন ব্যক্তির বিপক্ষে, নিকট অতীতে যিনি ইস্তাম্বুলের কঠিন জলসঙ্কট দূর করেছেন, যখন তিনি ইস্তাম্বুলের মেয়র ছিলেন। ইস্তাম্বুলবাসী কি এত সহজেই তা ভুলে যাবে!তবু ‘অবুঝ’ বিরোধীদের বুঝ দিয়ে এরদোগান বলেছেন, ইস্তাম্বুলে পানি সরবরাহ হয় মোট দশটি জলধারা থেকে। প্রকল্পের পথে পড়েছে মাত্র দু’টি। একটি পুরোপুরি, একটি আংশিক। তো ‘বহু জলধারা’ ঠিক নয়। প্রকল্প দ্বারা ইস্তাম্বুলের প্রয়োজনীয় পানির মোট তিনভাগ নষ্ট হবে। কিন্তু সরকার ম্যালেন ড্যাম নামে একটি বিশাল জলাধার নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা একাই ইস্তাম্বুলের পানির চাহিদা পুরণে যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ বর্তমানে তো নয়ই, যেন দূর ভবিষ্যতেও ইস্তাম্বুলে পানির সঙ্কট না হয়, সরকার সে জন্য যথেষ্ট সচেতন।বিরোধীপক্ষ মনে হয় যুক্তির পিছনে আদাজল খেয়েই লেগেছে! এখন তারা বলছে, এ প্রকল্পের কারণে দশহাজার হেক্টর ফসলী জমি নষ্ট হবে, ফলে ভয়াবহ খাদ্যসঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে।এ যুক্তির জবাব এরদোগান সরকারকে দিতে হয়নি, ভ‚মি ও খাদ্যবিষয়ে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞরাই বলেছেন ৭ লাখ লাখ ৮৩ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি দেশ মাত্র ৩০০ মিটার প্রস্থের একটি খালের জন্য খাদ্যসঙ্কটে পড়ে যাবে, সমাধানের কোন বিকল্প থাকবে না, এটা ঠিক নয়।বিরোধীপক্ষ তাতেও থেমে নেই, তারা নতুন যে যুক্তির আশ্রয় নিয়েছে তার নাম ভ‚মিকম্প। এ যুক্তির ধার ও ভার বেড়ে গিয়েছে সাম্প্রতিক ভ‚মিকম্পের ভয়াবহতার কারণে। তাদের কথা হলো, এই প্রকল্পের কারণে ইস্তাম্বুলে ভ‚মিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। কারণ এমনিই এলাকাটি ভ‚মিকম্পপ্রবণ। তাই খুবই আশঙ্কা যে, এ প্রকল্প ভ‚মিকম্পপ্লেটের উপর অত্যন্ত চাপ সৃষ্টি করবে এবং... এরদোগানের বলিষ্ঠ যুক্তি, খালের প্রস্তাবিত পথে ভ‚মিকম্পের কোন প্লেট নেই। এ বিষয়ে তুরস্কের কয়েকশ বিজ্ঞানী, ভ‚মিকম্পবিশেষজ্ঞ এবং ৩৫টিরও বেশী সংস্থা একত্রে একটি প্রতিবেদন তৈরী করেছে। তাতেও এরূপ আশঙ্কা নাকচ করা হয়েছে।তাছাড়া কথা হলো, ভ‚মিকম্প যে প্লেটের কারণে হয় তার অবস্থান ভ‚গর্ভের ১৫ থেকে ২৫ কিলোমিটার গভীরে। অথচ খালের গভীরতা হবে মাত্র ২১ মিটার। আর আমরা জানি, বহুতল ভবন বা পোলের জন্য এর চেয়ে কিছু বেশী গভীরেই যেতে হয়। সুতরাং...ভদ্রলোকদের শেষ যুক্তি, এই খালের মাধ্যমে ইস্তাম্বুলের একটি অংশ হয়ে যাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এখানে ভ‚মিকম্প বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে লাখ লাখ মানুষকে দ্রæত সরিয়ে নেয়া কঠিন হবে।মানুষকে হাসানোর জন্য এ যুক্তিটা না দিলেও চলতো। আমাদের অবশ্য হাসি পায়নি, কান্না পেয়েছে যে, কাদের মুখোমুখি হয়ে এরদোগানকে সামনের দিকে পথ চলতে হচ্ছে!ভ‚মিকম্পে আক্রান্ত মানুষ কী করে! ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় খালি জায়গায় অবস্থান করে। দূরে কোথাও যায় না। তাছাড়া এ দ্বীপটাই হলো ইস্তাম্বুলের প্রাণকেন্দ্র, যেখানে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকবে।২০২১ সালে যখন খালপ্রকল্পের প্রাথমিক উদ্বোধন করা হয় তখন সবাই ধরে নিয়েছিলো, এটি নিছক রাজনৈতিক চমক, যা কিছুদিন পরেই মানুষ ভুলে যাবে, এমনকি সরকারও। কিন্তু সরকার সম্পূর্ণ নীরবতার মধ্যে, খালের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমস্ত কাজ, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করেছে।সবকিছু বাদ দিয়ে নতুন যে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তা এই যে, প্রস্তাবিত এই খালের কোন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নেই। কারণ বিনাশুল্কে বসফরাস থাকতে কেন কোন জাহায বিপুল শুল্ক দিয়ে এ পথে যাবে!কথা হলো এরদোগান সরকার তো আর চিন্তা ভাবনা ছাড়া মাঠে নামেনি। এটা ঠিক যে, মন্ট্রেক্স চুক্তির কারণে তুরস্ক বসফরাস পারহওয়া কোন জাহায থেকে শুল্ক আদায় করতে পারে না। বব্যস্থাপনা -ব্যয় হিসাবে জাহাযপ্রতি সামান্য তিন-হাজার চারশ ডলার আদায় করতে পারে, যা শুল্ক কিছুতেই নয়।একটি হিসাব হলো, ২০১৯ সালে পানামা দিয়ে ১৩ হাজার সাতশ পঁচাশিটি জাহায পার হয়েছে, যাতে ২৫২ মিলিয়ন টন পণ্য গিয়েছে। আর কর্তৃপক্ষ বছরে আয় করেছে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। ওদিকে বসফরাস প্রণালী দিয়ে পার হয়েছে ৪১ হাজার একশ বারটি জাহাজ, পণ্য গিয়েছে ৬৪০ মিলিয়ন টন। কর্তৃপক্ষের আয় মাত্র এবং মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ জাহায গিয়েছে পানামা খালের চেয়ে তিনগুণ, অথচ পানামার আয় বসফরাসের চেয়ে পঁচিশগুণ বেশী। এই ভয়াবহ ক্ষতি তুরস্ক সহ্য করে এসেছে বছরের পর বছর এবং দশকের পর দশক। অথচ এর অর্ধেক জাহাযও যদি ইস্তাম্বুলখাল দিয়ে যায় তাহলেও আড়াই থেকে তিন বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে তুরস্ক। প্রশ্ন হলো, শুল্কমুক্ত বসফরাস থাকতে কোন জাহায কেন ইস্তাম্বুলখাল ব্যবহার করবে!করবে, কারণ একটি মালবাহী জাহাযের দৈনিক ভাড়া হলো  ১০ থেকে বিশ হাজার ডলার। তো  কোন জাহাযের বসফরাসে একদিন বসে থাকার অর্থ হলো সময় ও অর্থের বিপুল অপচয়। অথচ এখন ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বসে থাকতে হয় শুধু নৌজটের কারণে, যা দিন দিন বাড়বে ছাড়া কমবে না। তুরস্ক চাইলে তো অপেক্ষার সময় আরো বাড়াতে পারে। আবার বসফরাসের ‘নিরাপত্তা’র কারণে দৈনিক জাহায পারাপারের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারে। মন্ট্রেক্স চুক্তি অনুযায়ী তুরস্কের পক্ষে তা করা সম্ভব। তো এভাবে নতুন খাল দিয়ে দৈনিক পঞ্চাশটি জাহাযও যদি পার হয় তাহলেও তুরস্ক সরকার আড়াই থেকে তিন বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। তাছাড়া বছরের নির্দিষ্ট সময় বসফরাস খাল পূর্ণ বন্ধ রাখা যায় খালের ‘পরিবেশ’ রক্ষার জন্য, অথবা প্রয়োজনীয় ড্রেজিং...।১৯৩৬ সালের ২০ শে জুলাই মন্ট্রেক্স চুক্তি নামে একটি চুক্তি হয়, যার একপক্ষ তুরস্ক, অন্যপক্ষ বৃটেন ফ্রান্স, জাপান সোভিয়েট ইউনিয়ান, গ্রীস রুমানিয়া, যুগ¯øাভিয়া, বুলগেরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। ৫ অধ্যায় ও ২৯ অনুচ্ছেদের এই চুক্তি অনুযায়ী শান্তিকালীন সময়ে তুরস্ক কোন বাণিজ্যিক জাহায থেকে কোন প্রকার শুল্ক আদায় করতে পারবে না। কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী দেশগুলো ৩০হাজার টনের যুদ্ধ জাহায এই প্রণালী দিয়ে নিতে পারবে এবং কৃষ্ণসাগরে ২১ দিন পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবে। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে যেতে পারবে সর্বোচ্চ পনের হাজার টনের যুদ্ধজাহায। অন্যদিকে যুদ্ধকালীন সময়ে তুরস্ক চাইলে যুদ্ধজাহাযের চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দফা হলো, কোন দেশ যদি তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহলে তুরস্ক ঐ দেশের সামরিক -বেসামরিক জাহাযের চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে।ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে, ইস্তাম্বুলখাল ঐ চুক্তির আওতায় আসবে কি না। এরদোগান পরিষ্কার বলে দিয়েছেন এবসুলেটলি নটÑ বিলকুল না!ৃকৃষ্ণসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর উপস্থিতি নেই, যা রাশিয়ার জন্য যথেষ্ট স্বস্তির বিষয়। নতুন খাল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছু সুবিধা বয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে এ ভ‚রাজনৈতিক পরিস্থিতি রাশিয়ার জন্য উদ্বেগের কারণ, যদিও বর্তমানে রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক ভালো। কৌশলগত কারণে এরদোগান তার প্রস্তাবিত খালের ব্যবহারবিধি সম্পর্কে কিছুই বলছেন না। ফলে কোন পক্ষই বুঝে উঠতে পারছে না যে, বিরোধিতা করবে, না নীরবতা অবলম্বন করবে।তুরস্ক চাইলে, যুদ্ধজাহাযের উপর বিধিনিষেধ আরোপ অব্যশই করতে পারে। তবে করবে কি করবে না, এ সম্পর্কে এরদোগান  নীরব। শেষকথা হলো, শত্রæরা যদিও বলছে পরিবেশবিপর্যয়ের কথা, এরদোগান যদিও বলছেন, অর্থনীতির কথা, কিন্তু সবাই ভালো করেই জানে, এই খালখননের পিছনে পাঁচশ বছর আগে সুলতান সোলামানের দেমাগে কী ছিলো, এখন ‘সুলতান’ এরদোগানের চিন্তায় কী আছে! অর্থনীতিটা অনেক বড় বিষয় অবশ্যই। ডলারের বিচারে তিন বিলিয়ন ছোট অঙ্ক নয়, কিন্তু এটাই এখানে একমাত্র বিষয় নয়, আরো বড় বিষয় আছে, ভ‚রাজনৈতিক স্বার্থ, যা এই খালের মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এখনকার রুশ-ইউক্রেন পরিস্থিতির কথাই ধরুন। এরদোগান ও তার তুরস্ক খালি হাতেই কতটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সারা বিশ^ তাকিয়ে দেখলো, ইউক্রেনকে ড্রোন  দেয়া হচ্ছে, অথচ ন্যাটোভুক্ত দেশ হয়েও রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপে নেই। আবার যুদ্ধরত দু’টি দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করে বিশ^কে খাদ্যসঙ্কট থেকে উদ্ধার করেছে। আমার মনে হয়, এরদোগানকে যাদের ইচ্ছা, পছন্দ না করুন, এটা তো অন্তত স্বীকার করুন যে, সারা বিশে^ তিনিই একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক, যাকে শত্রæমিত্র সবার সমঝে চলতে হয়।তো বলছিলাম, এরদোগানের হাতে আজ যদি ইস্তাম্বুলখালের ট্রাম্পকার্ড থাকতো, তাহলে পুরো যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ থাকতো তুরস্কের হাতে! তিনি এককানে শুনতেন বাইডেনের কথা, অন্যকানে শুনতেন পুতিনের কথা! আর মুখে যা বলতেন তাতে...!এরদোগান, মুসলিমবিশে^র সম্পদ হিসাবে আল্লাহ্ আপনাকে ...!

 

বসফরাসপ্রণালী ও ইস্তাম্বুলখালপ্রকল্প

 

* ইস্তাম্বুলখালের প্রথম স্বপ্ন ও উদ্যোগ ছিলো উছমানী সালতানাতের দূরদর্শী সুলতান সোলায়মানের পক্ষ হতে। সালতানাতের স্থাপত্যবিশারদ মি’মার সিনান নকশা তৈরী করে জমা পর্যন্ত দিয়েছিলেন, কিন্তু ...

* তুরস্কের মোট আয়তন ৭৮৩৩৫৬ (সাতলাখ তেরাশিহাজার তিনশ ছাপ্পান্ন হাজার) বর্গমাইল। জনসংখ্যা ৮ কোটি ৩৬ লাখ।

* বসফরাস প্রণালী হচ্ছে কৃষ্ণসাগর থেকে কোন জাহাযের বাইরের সাগরে যাওয়ার একমাত্র পথ, যা তুরস্কের সার্বভৌমত্বের অন্তর্ভুক্ত। অথচ তুরস্ক এর কোন রাজস্ব পায় না, যেমন মিসর পায সুয়েজখাল থেকে।

* বসফরাস প্রণালীর দৈর্ঘ্য ৩০ কিলোমিটার (১৯ মাইল), প্রশস্ততা সর্বোচ্চ পৌনে চার কিলোমিটার থেকে সর্বনি¤œ মাত্র ৭৫০ মিটার। এর গভীরতা সবনি¤œ ৩৬ মিটার থেকে সর্বোচ্চ ১২৪ মিটার।

* বর্তমানে প্রতিবছর বিশাল আকারের আটচল্লিশ হাজার মালবাহী জাহায এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে, যার ফলে প্রণালীটি বিশে^র ব্যস্ততম নৌপথের একটি

* প্রস্তাবিত ইস্তাম্বুলখালের দৈর্ঘ্য হবে ৪২ কিলোমিটার (২৮ মাইল), প্রস্থ ২৭৫ মিটার (৯০০ ফুট) গভীরতা ২০.৭৫ (৬৮ ফুট)। ব্যয় ধারা হয়েছে ১৫০০ বিলিয়ন ডলার।

* আশা করা যায়, বার্ষিক রাজস্ব আয় হবে তিন বিলিয়ন ডলার, যা থেকে তুরস্ক এখন বঞ্চিত হচ্ছে..



 ইস্তাম্বুলখালপ্রকল্প উদ্বোধন উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট এরদোগান... 

* ইস্তাম্বুলখাল এমন একটি কৌশলগত প্রকল্প যা ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দেবে। 

* এ প্রকল্প তুর্কি অর্থনীতিতে ব্যাপক গতি সঞ্চার করবে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

* এ প্রকল্প তুরস্কের গৌরব এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমাদের উপহার।

* তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরী।

* ইস্তাম্বুলখাল তুরস্কের ইতিহাসের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প।

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

অন্যান্য লেখা