জিলহজ্ব ১৪৪০ হিঃ (৩/৮)

কাশগর/কায়রো

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবার গোলান দিয়ে দিলেন!

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

  এবার গোলান দিয়ে দিলেন!

 

অবস্থা দেখে মনে হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন মুসলিম বিশ্বের জন্য সাক্ষাৎ আযাবরূপেই ‘নাযিল’ হয়েছেন। মাত্র এই সেদিন তিনি কলমের একখোঁচায় মুসলিম উম্মাহ্র ‘দিলের ধড়কন’ ও হৃদয়ের স্পন্দন আলকুদস (জেরুযালেম) ইহুদীদের হাতে তুলে দিলেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার ইসলামী আবেগের তাড়নায় কিছু ডাকচিৎকার দিলেন। তাতে অবশ্য কর্ণপাত করার কোন গরয বোধ করেনি ইহুদি-খৃস্টান চক্র। কারণ ট্রাম্প জানেন, সউদী রাজা ও যুবরাজ তার হাতের মুঠোয়। সুতরাং ‘গোপন পরিকল্পনা’র যে গুঞ্জন চলছে তা ফিলিস্তীনী ‘কর্তৃপক্ষ’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের শায়খদের মেনে নিতে বাধ্য করা কঠিন কিছু নয়। হামাস, ওদের শায়েস্তা করার জন্য ‘ওরা’ই যথেষ্ট।

আলকুদসের আঘাত ও যখম এখনো সামলে উঠতে পারেনি মুসলিম উম্মাহ্, এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন আঘাত হানলেন গোলানের বিস্তৃত মালভূমি ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের হাতে তুলে দিয়ে এবং যথারীতি তাদেরই তৈরী যাবতীয় আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মনীতির সরাসরি লঙ্ঘন ঘটিয়ে।

গোলান হচ্ছে সিরিয়ার দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের একটি ভূখ-, বা মালভূমি, যার আয়তন ... বর্গ কিলোমিটার। আজ থেকে ৫২ বছর পূর্বে ১৯৬৭ সালে মিসর, সিরিয়া ও জর্দানের সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে ক্ষুদ্র ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের ‘যুদ্ধ নামে একটি প্রহসন’ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তখন গোলান সিরিয়ার হাতছাড়া হয় এবং ইসরাইলের দখলদারিত্বে চলে যায়। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে আরববাহিনী, বিশেষ করে সিরীয় বাহিনী গোলানের মালভূমি উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সুযোগ বুঝে ১৯৮১ সালে ইসরাইল গোলান মালভূমিকে নিজের অংশ বলে ঘোষণা দেয় এবং দ্রুত সেখানে বেশ কিছু ইহুদি বসতি গড়ে তোলে।

ভৌগোলিক ও সামরিক কৌশলগত দিক থেকে গোলান মালভূমির গুরুত্ব অপরিসীম।  গোলান মালভূমি থেকে মাত্র চল্লিশ মাইল দূরে রাজধানী দামেস্কের অবস্থান। সুতরাং সিরিয়ার জন্য যেমন রাজধানীর নিরাপত্তার জন্য গোলানের মালভূমি হচ্ছে ‘প্রাণভোমরা’তেমনি ইসরাইলের জন্য হচ্ছে রাজধানীসহ সমগ্র দেশে সিরীয় বাহিনীর গতিবিধির উপর খবরদারি করার জন্য ‘আদর্শ স্থান’। তাছাড়া গোলান মালভূমি হচ্ছে ইসরাইলের পানি সরবরাহের বড় উৎস। পুরো অঞ্চলটি তেলসম্পদেও ভরপুর।

গত ২৫শে মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘোষণার মাধ্যমে দখলকৃত গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের বৈধ ভূমি বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। বলাবাহুল্য, এ ঘোষণা হচ্ছে সকল আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন, যুক্তরাষ্ট্র যা দেখানোর দুঃসাহস করেছে শুধু মুসলিম বিশে^র অবস্থানগত দুর্বলতার কারণে।

জাতিসঙ্ঘের ২৪২ নম্বর সিদ্ধান্তে পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়েছে, ইসরাইলকে অধিকৃত অঞ্চল ছেড়ে দিতে হবে। এমনকি ১৯৮১ সনে ইসরাইলী পদক্ষেপকে জাতিসঙ্ঘ তার ৪৯৬ নম্বর সিদ্ধান্তে অবৈধ বলে নাকচ করে দিয়েছে। কিন্ত মনে হচ্ছে, দুনিয়াতে এখন চলছে জঙ্গলের আইন, যার নাম ‘জোর যার মুল্লুক তার’।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোলানঘোষণা’র পর এখন তো সারা বিশে^র সামনে এটা পরিষ্কার যে, সিরিয়া ট্রাজেডির মূল উদ্দেশ্যই ছিলো সিরিয়া ও তার শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে বিধ্বস্ত অবস্থায় নিয়ে আসা, যাতে গোলানের দিকে চোখ তুলে তাকাবার সাহসও না হয়। সবার মনে থাকার কথা, ২০১৭ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ৫৯টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিলো, যাতে বহু সাধারণ নাগরিক হতাহত হওয়ার পাশাপাশি সিরিয়ার ২০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছিলো। এরপর বিভিন্ন হামলার মাধ্যমে সিরীয় বিমানশক্তিকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ঐ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় সিরিয়ার দু’টি সামরিক ঘাঁটিতে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এস ৪০০ মোতায়েন ছিলো, যার সাহায্যে মার্কিন হামলা প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিলো, কিন্তু রাশিয়া তা করেনি। রাশিয়ার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে রুশ দৈনিক ‘ইজভেস্তিয়া’ বলেছে, ‘মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে রাশিয়া যদি পাল্টা ব্যবস্থা নিতো তাহলে রুশ-মার্কিন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়তো।’

বড়ি তাজ্জব কি বাত! এর সঙ্গে মিলিয়ে নিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর, ‘ট্রাম্প ও পুতিনের সম্মিলিত জোরালো সমর্থনের উপর ভর করেই দুর্নীতির দায়ে প্রবলভাবে অভিযুক্ত নেতানিয়াহু নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।’

এখন তো এমন সব তথ্য বের হয়ে আসছে এবং সেগুলোর উপর ভিত্তি করে আলজাজিরা ‘ডকুমেন্ট সিরিজ’ প্রচার করছে যাতে রাজনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞগণ নিশ্চিত হয়েছেন যে, আজকের বাশার আসাদের বাবা হাফিয আসাদের সময় গোলান মালভূমি ইসরাইলের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিলো। বিনিময়ে ইসরাইল হাফিয আসাদকে ক্ষমতা দখলে সাহায্য করেছিলেন, যখন ১৯৭১এ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নূরুদ্দীন আত্তাসীকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। মিসরের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের বন্ধু ড. মাহমূদ জামে’র মতে ইসরাইল হাফিয আসাদ ও তার ভাই রিফাতকে ১০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিলো, যা সুইস ব্যাংকে জমা করা হয়েছে।

এজন্যই ইসরাইল দম্ভভরে ঘোষণা করতে পারছে যে, গোলানের মালভূমি হচ্ছে ইহুদীদের প্রতিশ্রুত ভূমির অংশ, গোলান ছেড়ে দেয়া ইসরাইলের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।

এখন এটাও পরিষ্কার যে, ‘যোগ্য পিতার যোগ্য পুত্র’ সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদও গোলান মালভূমির চিন্তা ছেড়ে দিয়েছেন এবং এর বিনিময়েই বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকার নিশ্চয়তা লাভ করেছেন। মূলত একজনমাত্র ব্যক্তির ক্ষমতা ও সম্পদের মোহের বেদীতে বলী হয়ে চলেছে সিরিয়ার মত সর্বশক্তিতে বলীয়ান সুসমৃদ্ধ মুসলিম জনপদ। নিহত হয়েছে লাখ লাখ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। তদুপরি দেশছাড়া হয়ে ইউরোপের দেশে দেশে লাঞ্ছনা -পূর্ণ জীবনের শিকার হয়েছে হাজার হাজার শরণার্থী/ অভিবাসী।

আলকুদস নিয়ে যেমন তেমনি গোলান নিয়েও আরবনেতাদের কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনেই হয় না। বিশেষ করে খাদেমুল হারামাইন ও তার ‘স্বনামধন্য’ পুত্র। তারা বরং নিজ নিজ ক্ষমতা নিয়েই পেরেশান এবং আমেরিকা ও তার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আশীর্বাদ লাভের চেষ্টায় লবেজান। কারণ ‘দু’সপ্তাহতত্ত্ব’ তিক্ত বাস্তব। ইসরাইল ও ইহুদীবাদ তাদের জন্য কোন হুমকি নয়, তাদের জন্য বড় হুমকি তুরস্ক ও তার প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান, যিনি মুসলিম বিশে^র বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রতিটি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তার সীমিত সাধ্য নিয়ে প্রতিবাদ করে চলেছেন, যার জন্য তিনি আজ ইহুদি-খৃস্টান চক্রের চক্ষুশূল। তাই তুর্কী অর্থনীতির কোমর ভেঙ্গে দেয়ার জন্য বিশ^পুঁজিবাদ এখন উঠে পড়ে লেগেছে।

আমাদের শেষ কথা হলো- ‘ওরা চক্রান্ত করছে, আল্লাহ্ও ‘জবাবী চক্রান্ত’ করছেন, আর যত চক্রান্তকারী, আল্লাহ্ তাদের সর্বোত্তম।’

সুতরাং মুসলিম বিশ্বের অন্তত জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং কোরআন ও সুন্নাহ্কে আকড়ে ধরে তাহলে আল্লাহ্র কুদরতের মুকাবেলায় ইহুদী-খৃস্টানচক্রের সমস্ত চক্রান্ত নস্যাত হতে বাধ্য। নাছরুম্মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারীব। *

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

অন্যান্য লেখা