কাশ্মীরসংখ্যা

কাশগর/কায়রো

লোকসভায় যেভাবে পাস হলো কাশ্মীরপুনর্গঠন বিল

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

 

লোকসভায় যেভাবে পাস হলো

কাশ্মীরপুনর্গঠন বিল

৮/৮/১৯ বৃহস্পতিবার

তুমুল হট্টগোল ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে কাশ্মীরপুনর্গঠন বিলের প্রস্তাব ভারতের পার্লামেন্টের নিকক্ষ লোকসভায় গতকাল বুধবার বিপুল ভোটের ব্যবধানে পাস হয়েছে। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ৩৬৬, বিপক্ষে ৬৬। এর আগে গত সোমবার ৫/৮/১৯  সকালে ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটি সংসদের অনুমোদন লাভের পর প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ তাতে স্বাক্ষর করেন। প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দানকারী ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এরপর মঙ্গলবার সারা দিন কাশ্মীরপুনর্গঠন বিলের প্রস্তাব নিয়ে লোকসভায় আলোচনা চলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রস্তাবের সমর্থনে বলেন,  ৩৭০ অনুচ্ছেদের কারণে মানুষের মনে সংশয় জাগতো, কাশ্মীর আসলেই ভারতের অংশ কি না? এ ধারা বাতিলের পর এখন ভারত ও কাশ্মীরের মধ্যকার দেয়াল দূর হবে। জম্মু-কাশ্মীর যে চিরকালের জন্য ভারতের থাকবে তা নিশ্চিত করবে এই বিল।

কংগ্রেসের আপত্তির মুখে অমিত শাহ নেহরুকেও টেনে এনে বলেন, নেহরু কাশ্মীরপ্রসঙ্গ জাতিসঙ্ঘে টেনে না নিলে পাকিস্তানকবলিত আযাদ কাশ্মীর নামে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকতো না।

মন্তব্য অমিত বাবু! প-ত নেহরু যদি জাতিসঙ্ঘে ধরণা না দিতেন, ঠিকই বলেছেন, আযাদ কাশ্মীর নামে কিছু থাকতো না। তবে অধিকৃত কাশ্মীর বলেও কিছু থাকতো না। পুরো কাশ্মীর হতো পাকিস্তানের অংশ। শ্রীনগরের পতন নিশ্চিত বুঝতে পেরেই ‘ধুরন্ধর’ প-ত জাতিসঙ্ঘের আশ্রয় নিয়ে এবং গণভোটের ‘প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে কাশ্মীরের অধিকৃত অংশ রক্ষা করেছেন। আমাদের ‘সাদাদিল’ নেতৃবৃন্দও সরলমনে গণভোটের প্রস্তাব মেনে নিয়ে ‘জিহাদ’ বন্ধ করেছেন। কারণ তারা নিশ্চিত জানতেন, গণভোটের ফল পাকিস্তানের অনুকূলেই আসবে। যা জানতেন না তা হলো, গণভোট কখনো হবেই না!

৩৭০ অনুচ্ছেদ যদি এতই মন্দ হবে, তাহলে কেন এই ‘সাংবিধানিক মুলো’ কাশ্মীরীদের সামনে ঝুলানো হয়েছিলো? প্রতিশ্রুতির তাহলে আর কী বিশসযোগ্যতা থাকলো? তাছাড়া অমিত বাবু, আপনি কি ধরে নিয়েছেন, দশলাখ সৈন্য চিরকাল কাশ্মীর ‘পাহারা’ দেবে! আচ্ছা, অপেক্ষা করি, ইতিহাস চলতে থাক নিজের গতিতে।

ইমরান খানের প্রতি

মুফতিকন্যার কৃতজ্ঞতা

অধিকৃত কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ভারতপন্থী মেহবুবা মুফতির কন্যা ইলতিজা মুফতি, কাশ্মীরসমস্যা বিশসভায় উত্থাপনের কারণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে কাশ্মীরপ্রসঙ্গ উত্থাপন করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কাশ্মীরীদের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। দীর্ঘ সাত দশকের বিস্মৃত অবহেলিত প্রসঙ্গটি পুনরুজ্জীবিত করে তিনি কাশ্মীরীদের মধ্যে নতুন আশা ও উদ্দীপনা জাগ্রত করেছেন। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ। বিশসভায় তিনি আমাদের এবং প্রত্যেক কাশ্মীরীর মনের কথাই  বলেছেন। এজন্য আনন্দে উদ্বেলিত কাশ্মীরীরা রাস্তায় নেমে এসেছে।

ইলতিজা মুফতি, মা মেহবুবা মুফতির সুরে সুর মিলিয়ে বিবিসিকে আরো বলেন, ভারত সরকারের প্রতারণামূলক পদক্ষেপের পর কাশ্মীরের জনগণ এখন চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে যে, ভাগবাটোয়ারার সময় ভারতের সঙ্গে যোগ দেয়ার সিন্ধান্ত ঠিক ছিলো, না ভুল ছিলো? তিনি আরো বলেন, এটা এখন অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমান পরিস্থিতি কাশ্মীরী মুসলমানদের মধ্যে প্রচ- ভারতবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করেছে। দখলদার সরকার কাশ্মীরীদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আমাদের পরামর্শ সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছে।

কাশ্মীরের বর্তমান শসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সম্পর্কে ইলতিজা মুফতি বলেন, পুরো উপত্যকা-জুড়ে ভয়ভীতির পরিবেশ বিরাজ করছে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে মানুষ দিশেহারা। না আছে খাদ্য, না চিকিৎসার নূন্যতম কোন ব্যবস্থা। এমনকি জীবনরক্ষাকারী ঔষধেরও তীব্র অভাব।

উপত্যকায় সবধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করার পক্ষে ভারতের দেয়া অজুহাতের তীব্র সমালোচনা করে ইলতিজা বলেন, অধিকৃত কাশ্মীরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়ার কারণে শিশুবৃদ্ধ সবাই অস্থির পেরেশান। সরকার চায়, কাশ্মীর থেকে যেন কোন আওয়ায উঠতে না পারে। কিন্তু এটা তাদের সম্পূর্ণ ভ্রান্ত চিন্তা। ইন্টারনেট সেবা চালু হলেই মানুষ জানতে পারবে, দীর্ঘ বন্দীদশার সময় তাদের উপর দিয়ে কী বিপদ ও দুর্ভোগ গিয়েছে। তখন সবাই তাদের মনের  কষ্টগুলো তুলে ধরতে পারবে।

ইলতিজা, তার মায়ের উপর মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন।

মেহবূবা মুফতি ও তার কন্যা ইলতিজার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে ভারতের স্বনামধন্য মানবাধিকার কর্মী অরুন্ধতি রায় বলেছেন, কাশ্মীরে এখন লাখ লাখ মানুষ কাঁটাতারের মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তথ্যপ্রবাহের এ যুগে ভারত সরকার এত সহজে কি পারবে কাশ্মীরীদের বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে? সামনের সময়ই তা বলে দেবে, আমরা অপেক্ষায় থাকতে পারি। তবে ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, যুলুমের পতন অনিবার্য। তবে ইতিহাস থেকে কেউ... *

দুই কাশ্মীরে দুই বিপরীত চিত্র!

সুপ্রসিদ্ধ বাংলাভাষী ভরতীয় লেখক প্রবীর ঘোষ লিখেছেন, ‘একদিকে কাশ্মীরের ভারত-অংশে যেখানে লাখ লাখ সেনা নিয়োজিত, শুধু ‘শান্তি’ বজায় রাখার জন্য। যেখানে অহরহ চলছে হত্যা, গুম, ধর্ষণসহ সর্বপ্রকার অমানবিক নির্যাতন। ...

অন্যদিকে পাকিস্তানের তত্ত্বাবধানে আযাদ কাশ্মীরের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত! কোন সশস্ত্র প্রহরা নেই! কোন বিশৃঙ্খলা নেই, এমনকি নেই তেমন কোন রাজনৈতিক গোলমাল। প্রেসিডেন্ট স্বাধীনভাবে কার্যপরিচালনা করছেন। বিদেশ চষে বেড়াচ্ছেন সমগ্র কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ^জনমত গড়ে তোলার জন্য। অথচ আব্দুল্লাহ্ শুধু বিদেশে গিয়ে বিদেশী নেতার সঙ্গে সাক্ষাতের ‘অপরাধে’ ভারত সরকারের রোষানলে পড়েছেন!

আযাদ কাশ্মীরের আদালত কোন কোন বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে, যা ভারত-অংশে কল্পনাও করা যাবে না।

উপরের এই বিবরণ-চিত্র কী প্রমাণ করে? আনুষ্ঠানিক গণভোটের কি আর প্রয়োজন আছে? দুই কাশ্মীরের দুই ভিন্ন চিত্র কি প্রমাণ করে না যে, ভারত-অংশে কাশ্মীরের জনগণ চরম পরাধীনতা ও লাঞ্ছনার জীবন ভোগ করছে, বরং বলা ভালো, এক বৃহৎ কারাগারে বাস করছে। পক্ষান্তরে আযাদ কাশ্মীরের মানুষ স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করছে! সংক্ষেপে যদি বলি, আযাদ কাশ্মীরে ব্যালটের শাসন, আর ভারতীয় কাশ্মীরে আগাগোড়া বুলেটের শাসন। এ চিত্র দু’টো অস্বীকার করার কি কোন উপায় আছে? এখন প্রশ্ন হলো দৃশ্য দু’টো দেখে কাশ্মীর কি ভারতের সঙ্গে থাকতে চাইবে, না পাকিস্তানের সঙ্গে?                                                                                                

 

ভারতের ভাঙ্গন শুরু

চিদাম্বরম

প্রবীণ কংগ্রসনেতা ও সাবেক  কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম ভারতীয় জনগণকে সতর্ক করে দেয়ার ভঙ্গিতে বলেছেন- ‘এটা যদি জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে করা যায় তাহলে দেশের যে কোন রাজ্য ও প্রদেশের সঙ্গেই করা যাবে।

চিদাম্বরম তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, প্রথমে রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটানো হবে। তারপর রাষ্ট্রপতিশাসন জারি করা হবে। বিধানসভা ভেঙ্গে দেয়া হবে। বিধানসভার ক্ষমতা সংসদের হাতে যাবে। সরকার সংসদে একটা প্রস্তাব আনবে। সংসদ অনুমতি দিয়ে দেবে। ব্যস্, রাজ্য আর রাজ্য থাকবে না। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এটাই তো ঘটলো! তো এটা অন্য কোন রাজ্যের সঙ্গে কেন ঘটতে পারবে না?!

চিদাম্বরম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যখনই সরকার ইচ্ছা করবে, যে কোন রাজ্যকে এভাবে ভেঙ্গে দিতে পারবে। এরপর সেটাকে দু’টি বা তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা যাবে।

ভারতের এককালের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী এরপর যে বিস্ফোরক মন্তব্যটি করেন তা হলো, ‘এই সরকার যদি এভাবেই এগুতে থাকে তাহলে ধরে নিন, এখন থেকেই ভারতের ভাঙ্গন শুরু হয়ে গেলো।

অন্য এক বিরোধীদলীয় নেতা গোলাম নবী আযাদ সরকারের পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানকেই শুধু হত্যা করা হলো না, বরং সমস্যার একটা স্থায়ী বিষবৃক্ষরোপণ করা হলো।

একসময়ের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ্ (যিনি কাশ্মীরের ভারতভুক্তির আসল রূপকার শেখ আব্দুল্লাহ্র পুত্র) গৃহবন্দী থাকার কারণে জনসমক্ষে আসতে পারছেন না। তাকে তামিলনাড়–-তে নিয়ে রাখা হয়েছে। তবে টুইটারের মাধ্যমে তিনি তার বক্তব্য দিয়েছেন এবং দিয়ে যাচ্ছেন। এক টুইটে তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের কাছে অপশন ছিলো ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার, এমনকি স্বাধীন থাকার। কিন্তু কাশ্মীরের জনগণ (আসলে বলতে হবে, ‘আমার পিতা’) যখন ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো তখন রাজ্যের মানুষ ভারতের উপর আস্থা রেখেছিলো। সে আস্থা আজ সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। তাহলে কাশ্মীরের জনগণ যদি মনে করে, গণতন্ত্র, অখ- ভারত, এগুলো শুধু বাত কি বাত, তাহলে কি ভুল হবে?

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্ত সুদূরপ্রসারী এবং বিপজ্জনক ফলাফল বয়ে আনতে পারে, যার নিয়ন্ত্রণ হয়ত কারো হাতেই থাকবে না।

 

ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নিন্দা

কাশ্মীরের সাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদা রহিত করার জন্য সংবিধান থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং ৩৫এ ধারা বাতিল করার বিষয়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রসগংঠন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া আলোচিত পদক্ষেপের উপর তীব্র অসন্তোষ ব্যক্ত করে বলেছে, কাশ্মীর- বিভাজনের এ সিদ্ধান্তের কারণে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। জম্মু ও কাশ্মীরকে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে আলাদা মর্যাদা দেয়া হয়েছিলো। এটা পরিবর্তন করার কোন কারণই ছিলো না, না রাজনৈতিক, না সামাজিক, আর  না অর্থনৈতিক। এ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরূপে সংবিধানবিরোধী।

ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অনুকরণে বাংলাদেশের বহুধাবিভক্ত বামপন্থী দলগুলোও ভারত সরকারকে নিন্দা জানিয়ে কিছু কর্মসূচী পালন করেছে, তার মধ্যে একটা হলো ‘মানববন্ধন’। অবশ্য লোকাভাবে তা চোখে পড়ার মত হয়নি। *

 

 

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

অন্যান্য লেখা