রবিউছ ছানী ১৪৪৫ হিঃ

তোমাদের পাতা

উচ্চতর স্তরের তালিবানে ইলমের উদ্দেশ্যে আদীব হুযূরের বয়ান

দরদী মালীর কথা শোনো: মাদানী নেছাব আকাবিরীনের চিন্তারই ফসল, তবে...

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

মাদানী নেছাব আকাবিরীনের চিন্তারই ফসল, তবে...

 

বিসমিল্লাহির-রাহমানির-রাহীমহামদ ও ছানা এবং দুরূদ ও সালামের পর ।

আমার পেয়ারে তালিবানে ইলম। السلام علـيكم ورحـمـة الله وبـركاتـه আজ তোমাদের সামনে আমি নেছাবে তা‘লীম ও নেযামে তা‘লীম সম্পর্কে কিছু মৌলিক কথা বলতে চাই। ‘কিছু’ শব্দটির ব্যবহার এখানে রূপক অর্থে বা প্রচলিত বিনয়ের উদ্দেশ্যে নয়, প্রকৃত অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। বস্তুত নেছাব ও নেযামের প্রাসঙ্গিক ও পাশর্^বিষয় তো বটেই, মৌলিক আলোচনাও এমন দীর্ঘ হওয়ার কথা যা কয়েক মজলিসেও সম্পন্ন করা কঠিন। নেছাবে তা‘লীম ও নেযামে তা‘লিম সম্পর্কে যখন বিলকুল ছাতহিয়্যাত ও উপরিতার সঙ্গে আলোচনা হতে দেখি, বেশ কষ্ট হয়। বিশেষ করে নিজেদের সঙ্গে যারা মাদানী নেছাবের পরিচয় ‘প্রচার করে’ তারাও যখন তাড়াহুড়া ও উপরিতা প্রকাশ করে; তারাও যখন সাময়িকতায় আক্রান্ত হয়ে পদক্ষেপ নেয়, তাও আবার মাদানী নেছাবের ‘সংশোধন’-এর নামে, তখন সত্যি সত্যি আমার অন্তরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়।

নেছাবে তা‘লীম কখনোই সাময়িকতার দোষে দুষ্ট হওয়া উচিত নয়। নেছাবে তা‘লীম অন্তত একটি শতাব্দীর দীর্ঘ পরিসরের কথা চিন্তা করে তৈয়ার হওয়া উচিত এবং সে জন্য দীর্ঘ সময়ের নীরবচ্ছিন্ন সাধনা ও পরিশ্রমের প্রয়োজন, যা সত্যি ধৈর্যক্ষয়ী কাজ। অথচ...!

***

আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য প্রথমত বড় সান্ত¡নার বিষয় হলো, নেছাবপ্রসঙ্গে আমরাই প্রথম কথা বলছি না। বেশ আগে থেকেই আমাদের বড়রা এ বিষয়ে কথা বলে আসছেন। কোন কোন মাননীয় ব্যক্তিত্ব তো সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে যথেষ্ট সাহসী ও জোরালো মন্তব্য করেছেন, যা এমনকি আমরা আমাদের সময়েও বলার সাহস করতে পারিনি! বাংলাভাষায়ও সেগুলোর সঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে। তবে সত্য এই যে, বক্তব্য ও মন্তব্যের ক্ষেত্রে সংযম রক্ষা করার সমান্তরালে মৌলিক কিছু কাজ আল্লাহ্র রহমতে আমরা শুরু করেছি আজ থেকে দীর্ঘ চারদশক আগে, যা শুধু আল্লাহ্র তাওফীকেই সম্ভব হয়েছে। আমার খুব জোরালো ইচ্ছ্া রয়েছে, জীবন যদি বিশ^স্ত থাকে এবং তাওফীক যদি শামিলে হাল হয় তাহলে নিছাব সম্পর্কে আমাদের আকাবিরীনের যাবতীয় আলোচনা এবং বক্তব্য ও মন্তব্যের একটি পূর্ণাঙ্গ সঙ্কলন ও পর্যালোচনা তৈয়ার করার। পর্যালোচনার কথা বিশেষ করে বলতে হয় এ জন্য যে, আকাবিরীনের আলোচনা আসলে মতনের মত, যার সঠিক মর্ম অনুধাবন করা অনেক সময় অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। সঠিক কথার অঠিক অর্থ গ্রহণের প্রবণতা আমাদের মধ্যে বেশ দেখা যায়। আরেকটা কথা, যখন কেউ নেছাবের মত মৌলিক, বুনিয়াদি, নাযুক ও জটিল বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন, ‘সময় কম, সুতরাং... বলে, যখন এমন কিছু দেখি, অবাক হই এবং ব্যথিত হই। আমি বলি, এ বিষয়ে কথা যদি বলতে হয় প্রয়োজনীয় সময় হাতে নিয়ে এবং প্রচুর প্রস্তুতি নিয়েই বলা সমীচীন। দেখো, দৃঢ়তার সঙ্গেই আমার মনে হয়, নেছাব সম্পর্কে আল্লাহ্র রহমতে আমি এত দীর্ঘ সময় এবং এত দীর্ঘ পরিসরে কাজ করেছি যে, এ বিষয়ে কিছু কথা এখন অন্তত আমার তালিবানে ইলমের উদ্দেশ্যে আমি বলতে পারিÑالـديـن الـنـصـيـحـة এর আলোকে। বাকি আল্লাহ্ যেন দিলে দরদ দান করেন এবং   নিয়তে খুলূছ দান করেন, আমীন! আবারো বলছি, আমার কথাগুলো শুধু আমার তালিবানে ইলমের উদ্দেশ্যে, অন্য কারো উদ্দেশ্যে নয়।

***

আমাদের সর্বজনমান্য আলিম হযরত আল্লামা মুফতী তাক্বী উছমানী মু. তাঁর মহান পিতা মুফতিয়ে আযম পাকিস্তান, যিনি আগে থেকেই মুফতিয়ে আযম দারুল উলূম দেওবন্দ (এবং সঙ্গত কারণেই মুফতিয়ে আযম পাকভারত উপমহাদেশ), সেই ১৯৫০ সনে সম্ভবত কোন সুধি সমাবেশে তখনকার পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে (যা মোটামুটি একই আকারে ও প্রকারে উপমহাদেশের অন্তত তিনটি দেশে বিদ্যমান রয়েছে), একটি ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, বৃটিশভারতে মুসলিমানে হিন্দের জন্য তিনমুখী তিনটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ছিলো। দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষাব্যবস্থা, আলীগড় মুসলিম বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা এবং নদওয়াতুল উলামার শিক্ষাব্যবস্থা। পাকিস্তানে আমাদের আলীগড় বা নদওয়াতুল উলামার শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন নেই, এমনকি প্রয়োজন নেই দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষা -ব্যবস্থারও; আমাদের বরং প্রয়োজন (তৃতীয়) একটি শিক্ষা-ব্যবস্থার, যা আমাদের সম্পৃক্ত করবে মহান আসলাফ ও আকাবিরীনের পবিত্র ধারার সঙ্গে।...হযরত আল্লামা মুফতি তাক্বী উছমানী মু. নিজেই বলেছেন, ঐ সময় ঐ পরিবেশে প্রচলিত (দ্বীনী) শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে এমন মন্তব্য শাব্দিক অর্থেই ছিলো এক বিরাট ধামাকা। ধামাকা বলো, বা বিস্ফোরণ, হযরত মুফতি আযম রহ. এর ঐ মন্তব্য ছিলো অত্যন্ত বাস্তব অনুভ‚তি থেকে উৎসারিত এবং মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। দেখো, বৃটিশভারতে প্রচলিত তিন শিক্ষাব্যবস্থার শিরোনাম উল্লেখ করা হয়েছে স্থান ও প্রতিষ্ঠানকে ভিত্তি করে। আমার মনে হয়, তার চেয়ে উপযুক্ত হবে, যদি শিরোনাম হয় তাত্তি¡ক ও আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে। যেমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা ছিলো যাবতীয় দ্বীনী উলূমকে কেন্দ্র করে, আখেরাতই যার প্রধান লক্ষ্য, এ শিক্ষাব্যবস্থার লালনভ‚মি ছিলো দারুল উলূম দেওবন্দ।দ্বিতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ছিলো জাগতিক  জ্ঞানের চর্চা-অনুশীলনের মাধ্যমে মুসলিমদের শুধু জাগতিক জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতি অর্জন। এ শিক্ষা -ব্যবস্থার লালনভ‚মি ছিলো আলিগড় বিদ্যাঙ্গন। স্যার সৈয়দের কাছে যার নাম ছিলো সম্ভবত দারুল উলূম বা  মাদরাসাতুল উলূম। তৃতীয় শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিলো এককথায়Ñالـجمع بـيـن الـجديـد الـصالـح والـقديـم الـنافع(উপযোগী নতুন ও উপকারী প্রাচীনের সমন্বয়)এ চিন্তার প্রবর্তক নদওয়াতুল উলামা, যার বাস্তব প্রয়োগ ও পরীক্ষা নিরীক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামা, লৌখনো। আমার মনে হয়, উপরে উল্লেখিত কোন শিক্ষাব্যবস্থাই এককভাবে মুসলিম উম্মাহ্র জন্য গ্রহণযোগ্য না হলেও প্রতিটিরই রয়েছে কিছু গুণ এবং কিছু দুর্বলতা, তবে সামগ্রিকভাবে যদি চিন্তা করা হয় তাহলে বলতেই হবে, নদওয়াতুল উলামার প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে অতীতের অধিক নিকট-বর্তী, বর্তমানের অধিক উপযোগী এবং ভবিষ্যতের জন্য অধিক সম্ভাবনাপূর্ণ। বিশেষ করে নদওয়াতুল উলামার যে শিরোনাম, তার উপর ভিত্তি করে সহজেই উম্মাহ্র জন্য অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার পথে যাত্রা শুরু করা সম্ভব, আর এটাই আমাদের মাদানী নেছাব ও মাদরাসাতুল মাদীনাহ্র চ‚ড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

আমাদের পাকভারত উপমহাদেশে, বরং সমগ্র মুসলিম বিশে^ জ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রে দ্বীন ও দুনিয়া নামে যে দুঃখজনক বিভাজন দেখা যায়, মূলত এটাই হলো উম্মাহ্র দুর্ভাগ্যের বড় কারণ। মুসলিম উম্মাহ্র নেছাবে তা‘লীম ও নেযামে তা‘লীমের মূল বুনিয়াদ হতে হবে ‘দুনিয়ার হাসানাহ এবং আখেরাতের হাসানাহ্’ একসঙ্গে দুটোই অর্জনের চেষ্টা করা, আর দু’টোই দ্বীনী ইলম, দু’টোই কোরআন ও সুন্নাহ্র ইলম। সন্দেহ নেই, অত্যন্ত কঠিন, জটিল, নাযুক ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ এটি, তবে উম্মাহ্র প্রকৃত কামিয়াবি ও সফলতা এবং গৌরব ও মর্যাদা এরই উপর নির্ভর করছে। সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র রহমতের উপর ভরসা করে মাদানী নেছাব ও মাদরাসাতুল মাদীনাহ্র নামে এ দুর্গম পথেই আমরা যাত্রা শুরু করেছি। আল্লাহ তাওফীক দান করুন, আমাদের সবার উপর আপন রহমতের ছায়া তিনি অব্যাহত রাখুন, আমীন।

***

মূলত উম্মাহ্র জন্য এ অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাই বলেছেন মুফতিয়ে আযম রহ.। পরবর্তী পর্যায়ে হযরত মাওলানা মুফতী মাহমূদ রহ. এ অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার কথাই বলেছেন আরো বিশদরূপে ‘ওয়া আল্লামা আদামাল আসমাআ’ শিরোনামে। আপন মহান পিতার বক্তব্যের ব্যাখ্যারূপে হযরত মূফতী তাকী উছমানী মু. উম্মাহ্র অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকর ও বাস্তব নমুনা হিসাবে উল্লেখ করেছেন মরক্কোর ফাস শহরে তৃতীয় হিজরীতে প্রতিষ্ঠিত জামেয়া কারাবীনের কথা। ঠিক আছে, তবে প্রশ্ন হলো, এই জামেয়া ও তার অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার মূল উৎস কোথায়! উত্তর হলো, নবুয়তের শিক্ষাঙ্গন ছোফফা, যার বুনিয়াদ ছিলো তিনটি, দুনিয়ার হাসানাহ, আখেরাতের হাসানাহ এবং ছোহবত ও তারবিয়াত। তো যদি আমরা মূল বুনিয়াদ বা উৎসের প্রসঙ্গে সরাসরি ছুফফার কথা বলি, বোধহয় ভালো হয়।

***

একটা কথা এখানে বলতে চাই। তা এই যে, আমাদের মহান পূর্ববর্তীগণ যুক্তিতর্ক ও আলোচনা পর্যালোচনার মারহালা আশা করি আমাদের অনুক‚লে পার করে দিয়েছেন বহু আগে। এখন আর কথা বলে সময় পার করার কোন যৌক্তিকতা নেই। আমাদের জন্য যে কাজ তারা রেখে গিয়েছেন, এখন কর্তব্য হলো, বাস্তব ময়দানে তার সফল বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হওয়া। ‘নতুন নেছাব জরুরি’, এটা এখন আর বলার বিষয় না, এখন জাতির জন্য নতুন নেছাব এবং অভিন্ন নেছাব তৈয়ার করা, এটাই হলো সময়ের দাবী। তবে আবারো বলছি, এ পথ যেমন কঠিন ও দুর্গম তেমনি পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ পথের একটা পদস্খলন, আল্লাহ্ না করুন, আমাদের থেকে আদায় করে নিতে পারে ‘শতাব্দীর মাশুল’। তাই প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে সর্বোচ্চ চিন্তা ও সতর্কতার সঙ্গে। ‘যারা বলেন, ‘সময় কম, সুতরাং...’ এটা আসলেই তাদের কাজ নয়। সবার কাজের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিয়তের প্রতি আস্থা রেখেই কথাটা বলছি। এটা একদু’দিনের কাজ নয়, এক দু’বছরেরও কাজ নয়, এটা পূর্ণ একজীবনের কাজ। এগুতে হবে অতিসাবধানে এবং শরহে ছদরের সঙ্গে। তারপর পিছানো যাবে না, কোনভাবে, কোন মূল্যে। যেমন বলা হয়েছে (বেলা তাশবীহ) জয় হোক বা পরাজয়, তোমরা তোমাদের জায়গা থেকে নড়বে না, পাখী আমাদের ছোঁ মেরে নিয়ে গেলেও না।

***

এখন যারা হিন্দুস্তান পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হুকুমতি চাপের মুখে এবং সনদের প্রয়োজনীয়তার নাম করে বিভিন্ন ‘পদক্ষেপ’ নিচ্ছেন, এমনকি দারুল উলূম দেওবন্দ থেকেও, আমি মনে করি এখানেও রয়েছে সাময়িক সুবিধা অসুবিধার প্রভাব। একটা কথা মনে রাখতে হবে, কোন ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ারূপে গ্রহণকরা পদক্ষেপ কখনো কোন বুনিয়াদি ফায়দা ও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। যাকিছু আমরা করবো তা যেন বাইরের চাপ থেকে না হয়, তা যেন পূর্ণরূপে ভিতরের উপলব্ধি থেকেই হয় এবং শুধু আল্লাহ্র রহমতের উপর ভরসা করে যাবতীয় প্রতিক‚লতা সম্পর্কে নির্ভয় হয়ে।

***

একটা প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পাই না। সেই ঊনিশশ’ পঞ্চাশের সময় হযরত মুফতী আযম রহ. যে সাহসী বক্তব্য রেখেছেন, দারুল উলূমের ভিত্তিস্থাপন হয়েছে কিন্তু তার পরে। অথচ শিক্ষাব্যবস্থা! তাতে ছিলো হুবহু দারুল উলূম দেওবন্দের অনুসরণ! দারুল উলূম তখন অভিন্ন শিক্ষার পথে যতদূর সম্ভব অগ্রসর হতে কি পারতো না! এমনকি দারুল উলূম দেওবন্দ আজ যে ‘সার্কুলার’ জারি করছে, যথেষ্ট মজবূর হয়ে, তার প্রয়োজনই তো হতো না, যদি তখনই অভিন্ন শিক্ষার অভিমুখে পথচলা শুরু হতো। হযরত তাক্বী উছমানী বলেন, দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষা-ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ কোন শিক্ষাব্যবস্থা ছিলো না। আসলে এটা ছিলো বৃটিশপ্রবর্তিত ধর্মহীন শিক্ষা-ব্যবস্থার মোকাবেলায় প্রতিক্রিয়া -স্বরূপ বিকল্প মাত্র।ঠিক আছে। কথাটা আমরাও বলি, কৈফিয়ত হিসাবে। প্রশ্ন হলো, দারুল উলূম করাচির সময়ও কি দারুল উলূম দেওবন্দের পরিস্থিতি ছিলো! নতুন চিন্তার সঙ্গে তখনো কি সময় এসেছিলো না নতুন পদক্ষেপর গ্রহণের!

***

একটা তিক্ত বাস্তবতা তো আমরা জানি, জাতির মোট শিক্ষার্থীর একটা ভগ্নাংশমাত্র আসে আমাদের কাছে! হযরত হাফেজ্জীহুযূর রহ. যেমন বলেছেন, জাতির মূল মেধা ও মস্তিষ্কই চলে যায় ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থার কাছে। ‘দ্বীনী’ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সন্দেহ নেই, এটা গুরুতর সঙ্কট, যা দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম দিন থেকে চলে এসেছে, আজো চলে আসছে! তখনো এবং এখনো, পুরো জাতি ছুটছে ধর্মহীন সাধারণ শিক্ষার পিছনে। আর আমরা আখেরাতের ভয় দেখিয়ে, কবরের দোহাই দিয়ে ‘তালিবে ইলম’ সংগ্রহের চেষ্টা করি।...কী এর কারণ!কারণ তো এটাই যে, আমাদের ‘দেওবন্দী শিক্ষাব্যবস্থা’ জাতির দ্বীন ও দুনিয়ার প্রয়োজন পুরা করার মত পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা নয়, ‘প্রতিক্রিয়া ও সাময়িক বিকল্পমাত্র’। আমার তো মনে হয়, দারুল উলূম দেওবন্দ যদি প্রথম থেকে অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার পথে চলা শুরু করতো, একসঙ্গে নয় ধীরে ধীরে, তৃণমূল থেকে, একটি, একটি শ্রেণী করে! তাহলে তো না ছাত্রের জন্য হাহাকার হতো, না অর্থের সঙ্কট হতো, আর না কাজের চাপ হতো।দারুল উলূম করাচি যদি প্রথমেই গতানুগতিক পথে মেশকাতপর্যন্ত না খুলে শুধু প্রথম জামাত দিয়ে শুরু করতো, অভিন্ন শিক্ষা, তাহলে আমার তো মনে হয় কাজটা সহজ হয়ে যেতো। আর আমরা পথচলা শুরু করতে পারতাম আরো অনেক পর থেকে।অনেক চিন্তাভাবনা করেই বলছি, যে পথ ও পন্থা তখন দারুল উলূম দেওবন্দে এবং পরে দারুল উলুম করাচিতে গ্রহণ করা হয়েছে তাতে পথচলা বরং আরো কঠিন হয়ে পড়েছিলো। কারণ মুসলিম জনসাধারণ ‘দুনিয়াবিমুখ ও আখেরাতমুখী’ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হতে প্রস্তুতই ছিলো না। অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে যে সমস্ত প্রতিক‚লতার কথা বলা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশী প্রতিক‚লতার মুখোমুখী কিন্তু তখন তাঁদের হতে হয়েছে, জাতির বিমুখতার কারণে।আসলে তখন সাহসী মন্তব্যের চেয়ে সাহসী পদক্ষেপের বেশী প্রয়োজন ছিলো।এখন মাদরাসাতুল মাদীনাহ্ ও মাদানী নেছাবের মাধ্যমে আমরা সেই বহু কাক্সিক্ষত ও বহু আলোচিত অভিন্ন শিক্ষার প্রতি অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছি, মাঠপর্যায়ের ‘একাডেমিক’ কাজের মাধ্যমে। অর্থাৎ আমরা চাই না, অমুক স্তর পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা চালু করতে। আমরা চাই অভিন্ন নেছাব ও নেছাবী কিতাব প্রস্তুত করে জাতির সামনে অভিন্ন শিক্ষার নূন্যতম একটি নমুনা তুলে ধরতে। মাদানী মাক্তাবের নেছাবী কিতাব যদি প্রস্তুত হয়ে যায় এবং তার আমলী নমুনাও যদি সামনে এসে যায় তাহলে আমরা মনে করি আল্লাহ্র রহমতে অল্পতেই অনেক দূর যাওয়া সম্ভব।

শেষ করার আগে আবারো বলছি, আমার এ বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে আমার তালিবানে ইলমের জন্য, এর বাইরে কারো জন্য নয়। তারপরো আমার কথায় ও চিন্তায় ভুল হওয়া অসম্ভব নয়, কেউ যদি যুক্তির সঙ্গে এবং দরদের সঙ্গে আমার ভুল সংশোধন করতে চান, আমি প্রস্তুত আছি, বাকি আল্লাহ ভরসা।

(সামনেও কথা হবে ইনশাআল্লাহ্)

وآخـر دعـوانـا أن الـحـمـد لله رب العالـمـيـن

 

 

 

কিতাবের পাতা এবং জীবনের পাতা

হাদীছের কিতাবে এবং কিতাবের পাতায় এই মহান হাদীছে কুদসী তো কম পড়িনিÑ ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহ্ বলবেন, আয় ইবনে আদম! আমি অসুস্থ ছিলাম, কিন্তু তুমি তো আমার তীমারদারিতে আসোনি!...বান্দা যখন অবাক হবে তখন আল্লাহ্ বলবেন, ‘তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলো, অথচ তুমি তার তীমারদারি করোনি! তুমি কি জানতে না যে, যদি তুমি তার তীমারদারিতে যেতে তাহলে সেখানে আমাকে পেতে!’এভাবে আল্লাহ্ বলবেন, আয় ইবনে আদম! ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম, তুমি তো আমাকে খাবার দাওনি।’ বান্দা যখন অবাক হবে, তখন আল্লাহ্ বলবেন, ‘তোমার কি জানা নেই যে, আমার অমুক বান্দা ক্ষুধার কষ্টে তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলো, অথচ তুমি তাকে খাবার দাওনি। তোমার কি জানা ছিলো না যে, যদি তাকে তুমি খাবার দিতে তাহলে সেটা আমার কাছে পেতে!’.....এই হাদীছের উপর আমলের বিষয়ে আমাদের মহান আকাবিরীনের জীবনের কত শত ঘটনাও তো পড়েছি, সেই হযরত আলী রা. ও ফাতিমা রা. থেকে শুরু করে! এমনকি এই নিকট অতীতে হযরত মাদানী রহ. এর জীবনে! কিন্তু কোথায়, আমাদের জীবনের পাতায় তো এর কোন প্রতিফলন নেই!আমার কলমের লেখা যাদের দৃষ্টি পর্যন্ত পৌঁছবে তাদের কাছে এই মিনতি রেখে বিদায় হলাম, আসুন আমরা আল্লাহ্কে কাছে পাওয়ার জন্য এবং আল্লাহ্র কাছে কিছু পাওয়ার জন্য এই মহান হাদীছে কুদসীর উপর এখন থেকেই সাধ্যমত আমল শুরু করি। হাঁ, সাধ্যমতই, সাধ্যের বাইরে নয়, তাতেই আমার আল্লাহ্ খুশী!

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

অন্যান্য লেখা